আপনার ট্যাক্সের টাকা কোথায় যাচ্ছে?
পর্ব ১: শামিমের হিসাব
শামিম মিয়া ঢাকার মিরপুরে একটা মুদি দোকান চালায়। ছোট দোকান, দুই শাটারের। সকাল সাতটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত বসে। মাসে আয়? খরচ বাদ দিয়ে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা। এই টাকায় চারজনের সংসার চলে। স্ত্রী, দুই সন্তান, আর বৃদ্ধ মা।
শামিম প্রতিদিন কর দেয়। জানেও না কত দেয়। চাল কিনলে ভ্যাট দেয়। তেল কিনলে ভ্যাট দেয়। সাবান, বিস্কুট, মোবাইল রিচার্জ, বিদ্যুৎ বিল, সব জায়গায় ভ্যাট ঢুকে আছে। দোকানের জন্য পণ্য কিনলে পাইকারি দামের ওপর ভ্যাট আছে। ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে ফি দেয়। মাসে হিসাব করলে শামিমের আয়ের ৮-১০% সরকারকে যায়, বিভিন্ন কর আর ফি হিসেবে।
বিনিময়ে শামিম কী পায়?
দোকানের সামনের রাস্তায় গর্ত। বর্ষায় হাঁটু পানি জমে। ছেলেকে সরকারি স্কুলে ভর্তি করেছে, ক্লাসে ৭০ জন ছাত্র, শিক্ষক আছেন দুইজন। মা অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতালে গেছে, ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তার পায়নি, শেষে প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বিদ্যুৎ দিনে তিন-চার ঘণ্টা থাকে না।
শামিম মাঝে মাঝে ভাবে: আমার ট্যাক্সের টাকাটা কোথায় যাচ্ছে?
এটা শুধু শামিমের প্রশ্ন না। ১৭ কোটি বাংলাদেশির প্রশ্ন। আর উত্তরটা যখন জানবেন, রাগ হবে। কিন্তু আগে একটা সংখ্যা দেখুন, যেটা সব সমস্যার মূলে।
পর্ব ২: লজ্জার সংখ্যা
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৮%।
এই সংখ্যাটা কতটা খারাপ, সেটা বুঝতে একটু প্রসঙ্গ দরকার। কর-জিডিপি অনুপাত মানে দেশের মোট অর্থনীতির কত শতাংশ সরকার কর হিসেবে সংগ্রহ করতে পারে। এটা সরকারের সক্ষমতার মাপকাঠি। স্কুল, হাসপাতাল, রাস্তা, পুলিশ, আদালত, সব কিছুর জন্য টাকা লাগে, আর সেই টাকা আসে কর থেকে।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত গত দেড় দশকে ৮-৯% এর মধ্যে আটকে আছে। উন্নতি হচ্ছে না। বরং ২০১৫ সালের পর কিছুটা কমেছে। আর ওপরে যে বিন্দুরেখাটা দেখছেন, ওটা আঞ্চলিক গড়, ১৫%। মানে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলো গড়ে প্রায় দ্বিগুণ কর সংগ্রহ করে।
এবার দেশগুলোকে আলাদা করে দেখুন:
ভিয়েতনাম ১৮%। ভারত ১৭%। থাইল্যান্ড ১৫%। ইন্দোনেশিয়া ১১%। আর বাংলাদেশ? ৮%। পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে কম। আফ্রিকার অনেক দেশও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি কর সংগ্রহ করে। OECD দেশগুলোর গড় ৩৩%। বাংলাদেশ তার এক-চতুর্থাংশও পারে না।
কেন এত কম? তিনটা কারণ।
প্রথমত, বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। বাংলাদেশের জিডিপির আনুমানিক ৪৩% অনানুষ্ঠানিক খাতে। মানে দেশের প্রায় অর্ধেক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড করের আওতার বাইরে। ছোট দোকান, রিকশাচালক, দিনমজুর, ফেরিওয়ালা, এরা কেউ আয়কর দেয় না। তাদের দোষ দিচ্ছি না। ব্যবস্থাটাই এমন যে তাদের ধরার উপায় নেই।
বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি আঞ্চলিক তুলনায় সবচেয়ে বড়। থাইল্যান্ডে ১৯%, ভিয়েতনামে ২২%, ইন্দোনেশিয়ায় ২৬%। বাংলাদেশে ৪৩%। এই বিশাল অর্থনীতি করের জালে আসে না।
দ্বিতীয়ত, ধনীরা কর এড়িয়ে যায়। বাংলাদেশে TIN (কর শনাক্তকরণ নম্বর) আছে প্রায় ১ কোটি মানুষের। কিন্তু নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেয় মাত্র ৩৫-৪০ লাখ। আর প্রকৃত আয়কর দেয়? ২০-২৫ লাখ। ১৭ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ২৫ লাখ আয়করদাতা। এটা শুধু দরিদ্রতার সমস্যা না। ঢাকায় যত গাড়ি চলে, যত ফ্ল্যাট বিক্রি হয়, যত সোনার দোকানে ভিড় হয়, সেই তুলনায় আয়কর রিটার্ন অবিশ্বাস্য রকম কম। বড় ব্যবসায়ী, জমির মালিক, পেশাজীবীদের একটা বড় অংশ কর ফাঁকি দেয়। আর কর বিভাগের দুর্নীতি সেটা সহজ করে দেয়।
তৃতীয়ত, পরোক্ষ করের ওপর অতিনির্ভরতা। সরকার সরাসরি আয়কর বাড়ানোর বদলে ভ্যাট আর শুল্কের ওপর নির্ভর করে। কারণ সেটা সংগ্রহ করা সহজ। পণ্যের দামের সাথে যোগ করে দিলেই হলো। কিন্তু এর মানে হলো শামিমের মতো সাধারণ মানুষ বেশি কর দেয়, আর ধনীরা কম দেয়।
দেখুন, মোট কর রাজস্বের সবচেয়ে বড় অংশ আসে ভ্যাট থেকে (৩৫-৩৭%)। এটা পরোক্ষ কর, সবাই সমানভাবে দেয়। শামিম যে চাল কেনে, তাতে যে ভ্যাট দেয়, একজন কোটিপতিও একই হারে দেয়। কিন্তু শামিমের আয়ের অনুপাতে এটা অনেক বেশি। ধনীদের কাছ থেকে সরাসরি আয়কর আদায় করার বদলে সরকার গরিবদের ওপর ভ্যাটের বোঝা চাপাচ্ছে।
এই তিনটা কারণ মিলে বাংলাদেশ আটকে আছে ৮% এ। আর এই ৮% দিয়ে সরকার কী করবে? ১৭ কোটি মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, নিরাপত্তা, সব কিছু? অসম্ভব। আর তাই যা হওয়ার তাই হচ্ছে: সরকার যা আয় করে তার চেয়ে অনেক বেশি খরচ করে।
পর্ব ৩: ঋণের খাদ
সরকারের আয় জিডিপির ১০%। খরচ ১৬-১৭%। এই ৬-৭% গ্যাপ প্রতি বছর ঋণ করে পূরণ করতে হয়।
সবুজ লাইন রাজস্ব, লাল লাইন ব্যয়। মাঝখানে যে লাল ছায়া দেখছেন, সেটা ঘাটতি। এই ঘাটতি প্রতি বছর বাড়ছে। ২০১০ সালে ব্যবধান ছিল ৩%। ২০২৫ সালে ৬.৫%। সরকার এই গ্যাপ পূরণ করে কীভাবে? ঋণ নিয়ে। দেশের ভেতর থেকে ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে, ব্যাংক থেকে ধার করে, আর বাইরে থেকে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেয়।
ঋণ নেওয়া নিজে কোনো সমস্যা না, যদি সেই ঋণের টাকা উৎপাদনশীল খাতে যায়। রাস্তা বানালে ব্যবসা বাড়ে, কর বাড়ে, ঋণ শোধ করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে ঋণের একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে ভর্তুকি আর সুদ পরিশোধে। উৎপাদনশীল বিনিয়োগে না।
সরকারি ঋণ জিডিপির ৪২% ছাড়িয়েছে। ২০১০ সালে ছিল ৩৩%। দশ বছরে ৯ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। এখনো "বিপদসীমা" (৫৫%) থেকে দূরে আছে, কিন্তু গতি দেখুন। যেভাবে বাড়ছে, ২০৩০ সালে ৫০% ছুঁতে পারে। আর শুধু মোট ঋণ না, আসল সমস্যা হলো সুদ।
এই চার্টটা ভালো করে দেখুন। সরকারের মোট রাজস্বের কত শতাংশ শুধু সুদ পরিশোধে চলে যায়। ২০১০ সালে ১৮% ছিল। ২০২৫ সালে ৩৩%। মানে সরকার যত টাকা আয় করে, তার এক-তৃতীয়াংশ শুধু আগের ঋণের সুদ দিতে গিয়ে শেষ। এই টাকা দিয়ে স্কুল বানানো যেত। হাসপাতাল বানানো যেত। রাস্তা বানানো যেত। কিন্তু সেটা যাচ্ছে ব্যাংকের সুদে।
এটাকে অর্থনীতিবিদরা বলেন "ক্রাউডিং আউট"। সুদ পরিশোধ উন্নয়ন ব্যয়কে সরিয়ে দিচ্ছে। শামিমের ছেলের স্কুলে শিক্ষক নেই কেন? কারণ সেই টাকা গেছে সুদে। হাসপাতালে ডাক্তার নেই কেন? কারণ সেই বাজেট গেছে সুদে। রাস্তায় গর্ত কেন? কারণ অবকাঠামো বাজেট কমিয়ে সুদ দিতে হচ্ছে।
আর সুদের পাশাপাশি আরেকটা বিশাল খরচ আছে যেটা বাজেটকে গিলে খাচ্ছে। ভর্তুকি।
পর্ব ৪: ভর্তুকির ফাঁদ
বাংলাদেশ প্রতি বছর বাজেটের একটা বিশাল অংশ খরচ করে ভর্তুকিতে। জ্বালানি ভর্তুকি, কৃষি ভর্তুকি, বিদ্যুৎ ভর্তুকি। শুনতে ভালো লাগে। "সরকার গরিব মানুষের জন্য তেলের দাম কম রাখছে।" কিন্তু বাস্তবতা আলাদা।
২০২২ সালে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সময় ভর্তুকি বাজেটের প্রায় ১২% গিলে খেয়েছে। সেই টাকা কোথা থেকে এলো? অন্য খাত থেকে কেটে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা থেকে কেটে জ্বালানি ভর্তুকি দেওয়া হলো।
আর এই ভর্তুকি কাদের কাজে আসে? গরিবদের? একটু ভাবুন। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস ভর্তুকিতে দেওয়া হয়। কিন্তু গ্যাসের সংযোগ আছে মূলত শহরের মধ্যবিত্ত আর ধনীদের বাড়িতে। গ্রামের শামিমের মায়ের রান্না হয় কাঠ বা গোবরে। বিদ্যুৎ ভর্তুকি? বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে কারখানা আর ধনীদের এসি। জ্বালানি ভর্তুকি? বেশি তেল খরচ করে গাড়ির মালিকরা। গরিবরা রিকশায় চলে, বাসে চলে।
IMF-এর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের জ্বালানি ভর্তুকির ৪০-৪৫% সুবিধা যায় আয়ের সবচেয়ে ওপরের ২০% মানুষের কাছে। আর সবচেয়ে গরিব ২০%? তারা পায় মাত্র ৭-৮%। মানে ভর্তুকি আসলে একটা "উল্টো রবিন হুড": গরিবের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে ধনীদের গ্যাস আর তেলের বিল কমানো হচ্ছে।
এখন পুরো ছবিটা দেখুন: বাজেটের টাকা কোথায় যাচ্ছে?
সবচেয়ে বড় খাত কোনটা? সুদ পরিশোধ। ১৪.২%। শিক্ষা ১১.৫%। স্বাস্থ্য মাত্র ৫.৪%। উন্নয়নশীল দেশের গড়ের তুলনায় বাংলাদেশ শিক্ষায় কম খরচ করে, স্বাস্থ্যে অনেক কম খরচ করে, আর সুদে অনেক বেশি খরচ করে।
WHO-র পরামর্শ অনুযায়ী একটা দেশের বাজেটের কমপক্ষে ৭-৮% স্বাস্থ্যে যাওয়া উচিত। বাংলাদেশে যায় ৫.৪%। UNESCO বলে শিক্ষায় কমপক্ষে ১৫-২০% যাওয়া উচিত। বাংলাদেশে যায় ১১.৫%। এই ঘাটতি কোথায় যাচ্ছে? সুদে আর ভর্তুকিতে।
শামিমের প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল। তার ট্যাক্সের টাকা যাচ্ছে পুরনো ঋণের সুদে, ধনীদের জ্বালানি ভর্তুকিতে, আর একটা অদক্ষ আমলাতন্ত্র পোষায়। তার ছেলের স্কুলে আর তার মায়ের হাসপাতালে খুব কম পৌঁছায়।
কিন্তু এটাকে অবশ্যম্ভাবী মনে করবেন না। এটা কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম না। এটা নীতিগত পছন্দ। আর পছন্দ বদলানো যায়।
পর্ব ৫: যদি আমরা চাইতাম
ধরুন, বাংলাদেশ তার কর-জিডিপি অনুপাত ৮% থেকে ১২% এ নিয়ে যেতে পারলো। এটা কি অসম্ভব? না। ভিয়েতনাম ১৮%, ভারত ১৭%। ১২% মানে এখনো আঞ্চলিক গড়ের নিচে। এটা একটা বাস্তবসম্মত, মাঝামাঝি লক্ষ্য।
৪ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ালে কী হয়? বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলার। ৪% মানে অতিরিক্ত প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি টাকায়? প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। প্রতি বছর।
এই অতিরিক্ত ২ লাখ কোটি টাকা দিয়ে কী কী করা যেত? সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চালু করা যেত, যেখানে শামিমের মাকে হাসপাতালে ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হতো না। শিক্ষা বাজেট দ্বিগুণ করা যেত, যেখানে প্রতি ক্লাসে ৩০ জন ছাত্র আর যথেষ্ট শিক্ষক থাকতো। দশ হাজার কিলোমিটার নতুন রাস্তা বানানো যেত। পঞ্চাশটা জেলা হাসপাতাল আধুনিক মানে উন্নীত করা যেত।
কীভাবে ১২% এ পৌঁছানো যায়? তিনটা পদক্ষেপ।
পদক্ষেপ ১: কর জাল বিস্তৃত করা। বাংলাদেশে ২৫ লাখ আয়করদাতা থেকে এটা ১ কোটিতে নিয়ে যেতে হবে। কীভাবে? ডিজিটাল লেনদেন বাধ্যতামূলক করা। একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের ওপরে সব কেনাকাটা ডিজিটালে হলে লেনদেনের রেকর্ড থাকে, কর ফাঁকি কঠিন হয়। ভারত এটা করেছে। UPI চালু করে ডিজিটাল লেনদেন বাধ্যতামূলক করেছে। ফলাফল? কর রাজস্ব ২০১৬ থেকে ২০২৪ এর মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বাংলাদেশে বিকাশ আর নগদ ইতিমধ্যে আছে। ভিত্তি তৈরি।
পদক্ষেপ ২: সম্পদ কর চালু করা। বাংলাদেশে জমি আর ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন হয় সরকারি "মূল্য"-তে, যেটা বাজার মূল্যের ৫০-৭০% কম। ঢাকায় একটা ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য ২ কোটি টাকা, রেজিস্ট্রি হয় ৬০ লাখে। এই গ্যাপ থেকে সরকার বিশাল রাজস্ব হারায়। সম্পত্তি কর বাজারমূল্যের ভিত্তিতে হলে, আর একটা প্রগতিশীল হারে হলে (বেশি সম্পত্তিতে বেশি কর), বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে।
পদক্ষেপ ৩: ভর্তুকি সংস্কার। জ্বালানি ভর্তুকি সবার জন্য না রেখে শুধু গরিবদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক করা। ইন্দোনেশিয়া ২০১৫ সালে জ্বালানি ভর্তুকি সংস্কার করেছে। তেলের ভর্তুকি তুলে নিয়ে সেই টাকা গ্রামীণ অবকাঠামো আর শিক্ষায় দিয়েছে। প্রথমে প্রতিবাদ হয়েছে, কিন্তু দুই বছরের মধ্যে ফলাফল দেখা গেছে: গ্রামের রাস্তা ভালো হয়েছে, স্কুলে শিক্ষক বেড়েছে, স্বাস্থ্যসেবা বেড়েছে। ভারতও LPG ভর্তুকি সরাসরি গরিবদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠায় (Direct Benefit Transfer), মধ্যস্বত্বভোগী নেই, লিকেজ কম।
এই তিনটা পদক্ষেপ কোনো বিপ্লব না। এগুলো প্রতিবেশী দেশগুলো ইতিমধ্যে করেছে বা করছে। বাংলাদেশ শুধু পিছিয়ে আছে।
কিন্তু একটা সতর্কতা। কর বাড়ানো মানেই ভালো, এটা সত্য না। কর বাড়াতে হবে, কিন্তু সেই সাথে খরচের স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। শামিম যদি দেখে তার ট্যাক্সের টাকায় সত্যিই স্কুলে শিক্ষক এসেছে, রাস্তার গর্ত বুজেছে, হাসপাতালে ডাক্তার বসেছে, তাহলে সে আরো কর দিতে রাজি হবে। কিন্তু যদি দেখে সেই টাকা দুর্নীতিতে হারিয়ে যাচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তাদের বিলাসে যাচ্ছে, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে যাচ্ছে, তাহলে সে কর এড়াবে। আর সেই এড়ানোটা অন্যায় হলেও, বোধগম্য।
কর সংগ্রহ আর কর ব্যয়, দুটোই একসাথে সংস্কার করতে হবে। একটা ছাড়া আরেকটা কাজ করবে না।
শামিমের কথায় ফিরে আসি।
শামিম প্রতিদিন সকালে দোকান খোলে। সারাদিন পরিশ্রম করে। মাসে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা আয় করে। সেই আয়ের একটা অংশ সরকারকে দেয়, ভ্যাট আর নানা ফি হিসেবে।
বিনিময়ে সে চায় তার ছেলে ভালো স্কুলে পড়ুক। তার মা অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাক। দোকানের সামনের রাস্তাটা অন্তত সমতল থাকুক। রাতে বিদ্যুৎ থাকুক।
এটা কোনো অবাস্তব দাবি না। এটা একটা নাগরিকের ন্যূনতম প্রত্যাশা। পৃথিবীর অনেক দেশ, বাংলাদেশের চেয়ে কম সম্পদ নিয়ে, এই ন্যূনতমটুকু দিতে পেরেছে। কারণ তারা কর সংগ্রহ করতে পেরেছে, সেই কর সঠিক খাতে খরচ করতে পেরেছে, আর নাগরিকদের কাছে জবাবদিহি থেকেছে।
বাংলাদেশ পারেনি। এখনো পারেনি। কিন্তু পারে। সম্পদ আছে, মানুষ আছে, প্রযুক্তি আছে। যেটা নেই সেটা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর প্রাতিষ্ঠানিক সততা।
শামিম জানে না তার ট্যাক্সের ঠিক কত টাকা সুদে যায়, কত টাকা ভর্তুকিতে যায়, কত টাকা দুর্নীতিতে হারায়। কিন্তু সে জানে রাস্তায় গর্ত, স্কুলে শিক্ষক নেই, হাসপাতালে ডাক্তার নেই। সে হিসাব বোঝে না, কিন্তু ফলাফল বোঝে। আর সেই ফলাফল তাকে বলছে: ব্যবস্থাটা ভাঙা।
প্রশ্ন হলো: কে সারাবে?