চা রপ্তানি কেন কমছে?
পর্ব ১: সিলেটের সবুজ পাহাড়ে
সকাল ছয়টা। শ্রীমঙ্গলের একটা চা বাগান। কুয়াশা এখনো সরেনি। রেণু বেগম পিঠে বাঁশের ঝুড়ি বেঁধে পাতা তুলছে। দুই আঙুল দিয়ে কচি ডগা টেনে ছিঁড়ে ঝুড়িতে ফেলছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায়। সারাদিনে রেণু তুলবে ১৮-২০ কেজি পাতা। দিনমজুরি পাবে ১৭০ টাকা। কোনো কোনো বাগানে ১২০ টাকা।
রেণুর মতো প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক বাংলাদেশের ১৬৭টি চা বাগানে কাজ করে। তাদের বেশিরভাগ নারী। বেশিরভাগ আদিবাসী সম্প্রদায়ের। তাদের পূর্বপুরুষদের ব্রিটিশরা এনেছিল ঝাড়খণ্ড, ওডিশা, ছোটনাগপুর থেকে, দেড়শ বছর আগে, চা বাগানে শ্রমিক হিসেবে।
বাংলাদেশের চা শিল্পের বয়স ১৬০ বছরের বেশি। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় প্রথম বাণিজ্যিক চা বাগান স্থাপিত হয়। ব্রিটিশ আমলে এই চা ছিল গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য। পাকিস্তান আমলেও চা বিদেশে যেত। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশ চা রপ্তানি করেছে বহু বছর।
কিন্তু আজ?
আজ বাংলাদেশ চা আমদানি করে।
হ্যাঁ, ঠিক পড়েছেন। যে দেশে ১৬৭টি চা বাগান আছে, ৬০,০০০ হেক্টরের বেশি জমিতে চা চাষ হয়, দেড় লাখ শ্রমিক প্রতিদিন পাতা তোলে, সেই দেশ এখন চা আমদানি করছে।
কীভাবে এটা হলো? কোথায় গেল সেই চা? উত্তর পেতে হলে প্রথমে উৎপাদনের ছবিটা দেখতে হবে।
বাংলাদেশের চা উৎপাদন আসলে বাড়ছে। ২০০৫ সালে ছিল ৬০ মিলিয়ন কেজি। ২০১০ সালে ৫৯। ২০১৫ সালে ৬৭। ২০২০ সালে ৮৬। ২০২৪ সালে প্রায় ১০৩ মিলিয়ন কেজি। শতকোটি কেজির মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ।
উৎপাদন বাড়ছে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
সমস্যাটা রপ্তানিতে। এই চার্টটা দেখুন।
২০০০ সালে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছিল প্রায় ২৬ মিলিয়ন কেজি চা। ২০০৫ সালে ১০ মিলিয়ন। ২০১৫ সালে ১.৫ মিলিয়ন। ২০২৪ সালে মাত্র ০.৮ মিলিয়ন কেজি। বিশ বছরে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৯৭%।
একটা দেশ যেখানে উৎপাদন ৭০% বেড়েছে, সেখানে রপ্তানি ৯৭% কমে গেছে। এই দুটো তথ্য পাশাপাশি রাখলে একটাই প্রশ্ন আসে: চা কোথায় যাচ্ছে?
উত্তর সোজা: চা খেয়ে ফেলছে বাংলাদেশের মানুষ।
পর্ব ২: চায়ের নেশা
বাংলাদেশের মানুষ চা ভালোবাসে। রাস্তার ধারে, অফিসে, আড্ডায়, সকালে, বিকেলে, সন্ধ্যায়, চা লাগে। ঢাকায় প্রতিটা গলিতে চায়ের দোকান। গ্রামে হাটবাজারে চায়ের দোকান। কলেজের সামনে চায়ের দোকান। এমনকি হাসপাতালের সামনেও চায়ের দোকান।
বাংলাদেশে আনুমানিক ৫ লাখের বেশি চায়ের দোকান আছে। প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি কাপ চা খাওয়া হয়। মাথাপিছু চা খাওয়ার পরিমাণ গত বিশ বছরে প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।
এই চার্টটা দেখুন।
২০০০ সালে বাংলাদেশে মাথাপিছু চা খাওয়ার পরিমাণ ছিল বছরে ০.২৫ কেজি। ২০১০ সালে ০.৩৫ কেজি। ২০২৫ সালে প্রায় ০.৫৮ কেজি। আর মোট ঘরোয়া ভোগ? ২০০০ সালে ৩০ মিলিয়ন কেজি। ২০২৫ সালে প্রায় ১০২ মিলিয়ন কেজি।
সমস্যাটা এখন পরিষ্কার। বাংলাদেশ ১০৩ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন করে, আর ঘরোয়া বাজারে ১০২ মিলিয়ন কেজি লাগে। রপ্তানির জন্য বাকি থাকে মাত্র ১ মিলিয়ন কেজি, যা দিয়ে কিছুই হয় না। আর ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে আমদানি দিয়ে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০০০ সালে ছিল ১৩ কোটি। এখন ১৭.৫ কোটি। জনসংখ্যা বেড়েছে ৩৫%। কিন্তু মাথাপিছু চা ভোগ বেড়েছে ১৩০% এরও বেশি। মানুষ বেড়েছে, আর প্রতিটা মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি চা খাচ্ছে। দুইয়ে মিলে ঘরোয়া চাহিদা বিস্ফোরণ ঘটেছে।
এটা কি খারাপ? না, মানুষের চা খাওয়া খারাপ না। সমস্যাটা হলো, আমরা এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে উৎপাদন যথেষ্ট দ্রুত বাড়াতে পারিনি। আর যেটুকু বেড়েছে, সেটা পুরোটা ঘরোয়া বাজারই গিলে খেয়েছে। রপ্তানির জন্য কিছু বাকি রাখেনি।
এদিকে বিশ্ববাজারে কী হচ্ছে? অন্য দেশগুলো কি বসে আছে?
পর্ব ৩: যুদ্ধে পিছিয়ে
বাংলাদেশ যখন ঘরোয়া চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, বিশ্বের বড় চা রপ্তানিকারক দেশগুলো তাদের বাজার দখল আরো পাকা করছে।
এই চার্টটা দেখুন।
কেনিয়া রপ্তানি করে বছরে ৫০০ মিলিয়ন কেজির বেশি। শ্রীলঙ্কা প্রায় ২৮০ মিলিয়ন কেজি। চীন ৩৬০ মিলিয়ন। ভারত ২২০ মিলিয়ন। আর বাংলাদেশ? ০.৮ মিলিয়ন কেজি। বিশ্ব চা রপ্তানিতে বাংলাদেশের অংশ শূন্যের কাছে।
একসময় বাংলাদেশ চা রপ্তানিতে বিশ্বের শীর্ষ দশে ছিল। এখন তালিকায় নামও নেই।
শুধু পরিমাণ না, দামেও বাংলাদেশ পিছিয়ে। চিত্রপুর নিলামে বাংলাদেশি চায়ের গড় দাম কেজিতে ২৫০-২৮০ টাকা। শ্রীলঙ্কার সিলন টি? কেজি প্রতি ৬-৮ ডলার (৬৫০-৯০০ টাকা)। কেনিয়ার উচ্চমানের চা? ৫-৭ ডলার। জাপানের মাচা? ৩০-১০০ ডলার। মানে শ্রীলঙ্কা একই ওজনের চা থেকে বাংলাদেশের চেয়ে তিনগুণ বেশি আয় করে।
কেন? মানের পার্থক্য।
এই চার্টটা দেখুন।
চিত্রপুর নিলামে (বাংলাদেশের প্রধান চা নিলাম কেন্দ্র) বিভিন্ন গ্রেডের চায়ের দাম দেখুন। BOP (Broken Orange Pekoe) সবচেয়ে দামি, তারপর Fannings, তারপর Dust। বাংলাদেশের বেশিরভাগ উৎপাদন হয় CTC (Crush, Tear, Curl) পদ্ধতিতে, যা থেকে বেশিরভাগই Dust আর Fannings গ্রেডের চা আসে। Orthodox (পুরোনো পাতা মোচড়ানো পদ্ধতি) চায়ের উৎপাদন নগণ্য।
সমস্যাটা হলো, বিশ্ববাজারে দাম বেশি পাওয়া যায় Orthodox আর বিশেষায়িত চায়ে (green tea, white tea, oolong)। CTC চা সস্তা, ব্লেন্ডিং-এর কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশ বেশিরভাগ CTC চা বানায়, কারণ ঘরোয়া বাজারে এটাই চলে (দুধ-চিনি দিয়ে তৈরি "লাল চা")। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রিমিয়াম দাম পেতে হলে Orthodox আর বিশেষায়িত চায়ের দিকে যেতে হবে।
শ্রীলঙ্কা এটা বুঝেছে। তারা Ceylon Tea কে বিশ্বমানের ব্র্যান্ড বানিয়েছে। "Ceylon Tea" বললে ক্রেতারা জানে এটা মানসম্পন্ন। বাংলাদেশি চায়ের কোনো ব্র্যান্ড পরিচিতি নেই আন্তর্জাতিক বাজারে।
পর্ব ৪: ১৬৭ বাগান, ৬০,০০০ হেক্টর, তবু যথেষ্ট না
বাংলাদেশে ১৬৭টি নিবন্ধিত চা বাগান আছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ সিলেট বিভাগে, মৌলভীবাজার আর হবিগঞ্জ জেলায়। কিছু আছে চট্টগ্রাম আর রাঙামাটিতে, আর কিছু পঞ্চগড়ে (উত্তরবঙ্গে, তুলনামূলক নতুন)।
এই চার্টটা দেখুন।
বাগানের সংখ্যা বাড়ছে, বিশেষত পঞ্চগড় অঞ্চলে ক্ষুদ্র চাষি (smallholder) যোগ হচ্ছে। কিন্তু প্রতি হেক্টরে উৎপাদনশীলতা (yield) কেমন?
বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে চা উৎপাদন প্রায় ১,৩৫০ কেজি। কেনিয়ায় ২,৬০০ কেজি। শ্রীলঙ্কায় ১,৫০০ কেজি। ভারতে ২,০০০ কেজি। বাংলাদেশ কেনিয়ার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করে একই জমিতে।
কেন এত কম? কারণগুলো পুরনো, পরিচিত, আর বছরের পর বছর অমীমাংসিত।
প্রথমত, চা গাছ পুরনো। বাংলাদেশের অনেক বাগানের গাছ ৫০-৮০ বছরের পুরনো। পুরনো গাছে পাতা কম আসে। নতুন, উচ্চফলনশীল ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন (replanting) দরকার, কিন্তু সেটা ব্যয়বহুল আর সময়সাপেক্ষ। একটা চা গাছ লাগানোর পর পাতা তুলতে ৪-৫ বছর লাগে। এই সময়ে বাগান মালিকের আয় থাকে না, কিন্তু খরচ থাকে।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি পুরনো। কেনিয়া আর শ্রীলঙ্কায় যন্ত্র দিয়ে পাতা তোলা হয়, প্রক্রিয়াজাতকরণ আধুনিক, মান নিয়ন্ত্রণ কঠোর। বাংলাদেশে এখনো হাতে পাতা তোলা হয় (যা মানের দিক থেকে ভালো হতে পারে, কিন্তু উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে)। প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা অনেক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ আমলের যন্ত্রপাতি দিয়ে চলে।
তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন। সিলেটের বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাচ্ছে। অসময়ে ভারী বর্ষা হচ্ছে, আবার শীতকালে খরা। চা গাছের জন্য সারা বছর সমানভাবে বিতরিত বৃষ্টি দরকার। সেটা আর পাওয়া যাচ্ছে না। ২০২২ সালের বন্যায় সিলেটের অনেক চা বাগান তলিয়ে গিয়েছিল, ক্ষতি হয়েছিল শত কোটি টাকার।
পর্ব ৫: মানের গল্প, গ্রেডিংয়ের গল্প
চায়ের জগতে মান (quality) সবকিছু। একই চা গাছের পাতা থেকে বিভিন্ন গ্রেডের চা তৈরি হয়। কচি ডগা থেকে সেরা মান, পুরনো পাতা থেকে নিম্নমান।
বাংলাদেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৫০% হলো Dust গ্রেড, সবচেয়ে নিম্নমান। Fannings আরো ২৫%। BOP (ভালো মান) মাত্র ১৫%। আর Orthodox বা বিশেষায়িত চা (green, white)? মাত্র ২%।
এর সাথে তুলনা করুন শ্রীলঙ্কার সাথে। শ্রীলঙ্কায় Orthodox চায়ের অংশ ৫০% এরও বেশি। তাদের চায়ের গড় রপ্তানি মূল্য বাংলাদেশের তিনগুণ।
মান উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ চা বোর্ড (BTB) কাজ করছে। চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (BTRI) নতুন ক্লোন উদ্ভাবন করেছে, উচ্চফলনশীল BT ক্লোন সিরিজ। কিন্তু বাগান পর্যায়ে গ্রহণ ধীর। বাগান মালিকরা ঝুঁকি নিতে চান না। CTC চা ঘরোয়া বাজারে বিক্রি হয়ে যায়, লাভ কম হলেও নিশ্চিত। Orthodox চা বানাতে আলাদা যন্ত্রপাতি লাগে, প্রশিক্ষণ লাগে, আর বাজার খুঁজতে হয়।
আর একটা আশার আলো আছে: ক্ষুদ্র চা চাষি (smallholder)।
পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, এই জেলাগুলোতে ক্ষুদ্র চাষিরা চা চাষ শুরু করেছে। ২০০০ সালে ক্ষুদ্র চাষির সংখ্যা ছিল ৫০০ এর কম। ২০২৫ সালে প্রায় ৫,০০০। তারা ছোট ছোট জমিতে (০.৫-২ হেক্টর) চা চাষ করে বড় বাগানের কারখানায় কাঁচা পাতা বিক্রি করছে।
এটা ইতিবাচক। কেনিয়ার চা শিল্পের সাফল্যের পেছনে ক্ষুদ্র চাষিরাই মূল শক্তি। কেনিয়ায় মোট চা উৎপাদনের ৬০% আসে ক্ষুদ্র চাষিদের থেকে। বাংলাদেশে এখনো ১০% এর কম। কিন্তু বাড়ছে।
পর্ব ৬: আমদানির রাস্তায়
সবচেয়ে বিচিত্র ব্যাপারটা হলো চা আমদানি।
বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে নিয়মিত চা আমদানি করছে। ২০১৮ সালে আমদানি ছিল ৫ মিলিয়ন কেজি। ২০২৫ সালে প্রায় ২২ মিলিয়ন কেজি। আমদানির উৎস মূলত ভারত, কেনিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া।
কেন আমদানি করতে হচ্ছে? কারণ ঘরোয়া চাহিদা উৎপাদনের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। আর কিছু বিশেষ ধরনের চা (green tea, flavoured tea) বাংলাদেশে তৈরি হয় না, সেগুলোও আমদানি।
ভাবুন একবার। বাংলাদেশ একসময় ২৬ মিলিয়ন কেজি চা রপ্তানি করতো। এখন ২২ মিলিয়ন কেজি আমদানি করছে। ৪৮ মিলিয়ন কেজির পার্থক্য। এটা শুধু বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবেই বড়। রপ্তানি থেকে আয় হারিয়েছে, আর আমদানিতে ডলার খরচ হচ্ছে।
হিসাবটা সোজা। ২০০০ সালে চা খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসতো (রপ্তানি)। ২০২৫ সালে চা খাতে বৈদেশিক মুদ্রা যাচ্ছে (আমদানি)। সুইং: প্রায় ৪০-৫০ মিলিয়ন ডলার। বিশাল অঙ্ক না, কিন্তু একটা দেশের জন্য যেখানে প্রতিটা ডলার মূল্যবান, এটা অবহেলা করার মতো না।
তাহলে কী করা যায়?
প্রথমত, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। পুরনো গাছ প্রতিস্থাপন করতে হবে উচ্চফলনশীল ক্লোন দিয়ে। BTRI এর BT-১ থেকে BT-২১ ক্লোনগুলো পরীক্ষিত, ফলন ৫০-৮০% বেশি। সরকারকে প্রতিস্থাপন ভর্তুকি দিতে হবে, কারণ বাগান মালিক একা পারবে না।
দ্বিতীয়ত, মান বাড়াতে হবে। Orthodox চা, green tea, specialty tea এর দিকে একটা অংশকে নিয়ে যেতে হবে। সবটা না। CTC চা ঘরোয়া বাজারের জন্য থাকবে। কিন্তু ১০-১৫% উৎপাদন যদি প্রিমিয়াম গ্রেডে যায়, সেটা রপ্তানি আয় বহুগুণ বাড়াবে।
তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র চাষিদের সম্প্রসারণ করতে হবে। পঞ্চগড় মডেল কাজ করছে। এটা বরিশাল, ময়মনসিংহ, বান্দরবান, অন্যান্য উপযুক্ত এলাকায় নিয়ে যেতে হবে। ক্ষুদ্র চাষিদের প্রশিক্ষণ, চারা, আর বাজার সংযোগ দিতে হবে।
চতুর্থত, ব্র্যান্ডিং। "Bangladesh Tea" কে একটা পরিচিতি দিতে হবে। শ্রীলঙ্কা "Ceylon Tea" ব্র্যান্ডের পেছনে কয়েক দশক ধরে বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশের সিলেটি চায়ের নিজস্ব স্বাদ আছে, মাটি আর আবহাওয়ার কারণে যেটা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এই বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগাতে হবে।
আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।
রেণু বেগম আজও সকালে চা বাগানে যাবে। পিঠে ঝুড়ি বেঁধে পাতা তুলবে। ১৮-২০ কেজি। ১৭০ টাকা পাবে। তার তোলা পাতা দিয়ে যে চা তৈরি হবে, সেটা ঢাকা বা চট্টগ্রামের কোনো চায়ের দোকানে বিক্রি হবে। বিদেশে যাবে না।
একসময় রেণুর মতো শ্রমিকদের হাতে তোলা পাতা লন্ডনের নিলামে বিক্রি হতো। বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশি চায়ের জন্য অপেক্ষা করতো। সেই দিন গেছে।
চা বাংলাদেশের ঐতিহ্য। ১৬০ বছরের পুরনো শিল্প। ১৬৭টি বাগান, দেড় লাখ শ্রমিক, ৬০,০০০ হেক্টর জমি। এই সম্পদ আমাদের আছে। যেটা নেই সেটা হলো দূরদৃষ্টি। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পরিকল্পনা। মান উন্নয়নের বিনিয়োগ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের কৌশল।
কেনিয়া, যে দেশে চা চাষ শুরু হয়েছে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক পরে, তারা আজ বিশ্বের শীর্ষ চা রপ্তানিকারক। তাদের রহস্য? ক্ষুদ্র চাষিদের সংগঠিত করা, গবেষণায় বিনিয়োগ, মান নিয়ন্ত্রণ, আর সরকারি নীতি সহায়তা।
বাংলাদেশের চা হারিয়ে যায়নি। এটা এখনো আছে, সবুজ পাহাড়ে, রেণুর ঝুড়িতে, চিত্রপুরের নিলামে। শুধু আমরা একে রপ্তানি পণ্য হিসেবে হারিয়ে ফেলেছি। ঘরোয়া চাহিদার জোয়ারে ভেসে গেছে রপ্তানির সম্ভাবনা।
প্রশ্ন হলো: আমরা কি শুধু চা খেয়ে যাবো, নাকি চা বিক্রি করেও শিখবো?