চা বাগানের শ্রমিক: ২০২৬ সালেও দাসত্ব?
পর্ব ১: এক কাপ চায়ের পেছনে
সকাল পাঁচটা। শ্রীমঙ্গলের কুয়াশায় ভেজা একটা চা বাগান। কমলা (৩৮) পিঠে বাঁশের ঝুড়ি বেঁধে হাঁটতে শুরু করেছে। আজ তাকে ২৩ কেজি কাঁচা পাতা তুলতে হবে। এর কম হলে মজুরি কাটা যাবে। বেশি হলে? কিলোপ্রতি অতিরিক্ত দুই টাকা পাবে।
কমলার দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা। মাসে ২৬ দিন কাজ করলে পায় ৪,৪২০ টাকা। এই টাকায় তার পরিবারের চারজনকে খাওয়াতে হয়। বাগানের যে "লাইন হাউস"-এ থাকে, সেটা ব্রিটিশ আমলে তৈরি। দুই পরিবার একটা ঘরে, মাঝখানে পাতলা দেয়াল। টয়লেট কমন, পানি পাম্প থেকে আনতে হয়।
কমলা জানে না, তার হাতে তোলা চা পাতা যখন "সিলেট টি" বা "ইস্পাহানি" ব্র্যান্ডে বাজারে আসে, প্রতি কেজি বিক্রি হয় ৬০০ থেকে ১,২০০ টাকায়। কমলা ২৩ কেজি পাতা তোলার বিনিময়ে পায় ১৭০ টাকা। মানে কেজিপ্রতি সাত টাকারও কম।
এই গল্প শুধু কমলার না। বাংলাদেশে প্রায় ১৬৭টা চা বাগানে দেড় লাখেরও বেশি নিবন্ধিত শ্রমিক কাজ করে। অনিবন্ধিত, মৌসুমি, আর ক্যাজুয়াল শ্রমিক ধরলে সংখ্যাটা তিন লাখের কাছাকাছি। তাদের প্রায় সবাই আদিবাসী বা দলিত সম্প্রদায়ের। ব্রিটিশ আমলে বিহার, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ থেকে "গিরমিটিয়া" (চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক) হিসেবে আনা হয়েছিল তাদের পূর্বপুরুষদের। ১৫০ বছর পরে তাদের বংশধররা একই বাগানে, একই কাজ করছে।
২০০০ সালে চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ২৮ টাকা। ২৫ বছরে বেড়ে হয়েছে ১৭০ টাকা। সংখ্যায় ছয়গুণ বৃদ্ধি। কিন্তু একটু থামুন। এই সময়ে চালের দাম বেড়েছে পাঁচগুণের বেশি, ভোজ্যতেলের দাম চারগুণ, বাড়িভাড়া ছয়গুণ। মানে কমলার "বেড়ে যাওয়া" মজুরি আসলে তাকে ২০০০ সালের চেয়ে খুব বেশি ভালো অবস্থানে আনেনি।
পর্ব ২: বাংলাদেশের সবচেয়ে সস্তা শ্রম
চা শ্রমিকের মজুরি কি সত্যিই বাংলাদেশের সবচেয়ে কম? তুলনা করে দেখুন:
গার্মেন্টস শ্রমিক দিনে পায় ৪৮০ টাকা (ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকা, ২৬ দিনে ভাগ)। নির্মাণ শ্রমিক পায় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। কৃষি শ্রমিক পায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। আর চা শ্রমিক? ১৭০ টাকা। গার্মেন্টস শ্রমিকের তিনভাগের একভাগেরও কম। কৃষি শ্রমিকের অর্ধেকেরও কম।
প্রশ্ন হলো: কেন? কেন চা শ্রমিকের মজুরি এত কম?
উত্তরটা ইতিহাসে লুকিয়ে আছে। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় প্রথম বাণিজ্যিক চা বাগান শুরু হয়। ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো মধ্য ভারত থেকে আদিবাসী মানুষদের নিয়ে আসে, প্রতারণা আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে। তাদের বলা হয়েছিল "সোনার দেশে" যাচ্ছ, ভালো মজুরি পাবে, জমি পাবে। পেয়েছিল শৃঙ্খল। "ওয়ার্কম্যান'স ব্রিচ অফ কন্ট্র্যাক্ট অ্যাক্ট, ১৮৫৯" অনুযায়ী, চুক্তি ভেঙে বাগান ছেড়ে গেলে জেল হতো।
সেই ঔপনিবেশিক কাঠামো আজও মূলত অক্ষত। চা শ্রমিকরা বাগানের ভেতরে থাকে, বাগানের বাইরে তাদের জমি নেই, বাড়ি নেই, বিকল্প কর্মসংস্থান নেই। বাগান তাদের থাকার জায়গা দেয়, রেশন দেয় (সপ্তাহে ৩.৫ কেজি আটা বা চাল, ৩৫ টাকা দামে), চিকিৎসা দেয় (নামেমাত্র)। এই "সুবিধা"-র অজুহাতে মজুরি কম রাখা হয়। মালিকপক্ষ বলে, "আমরা তো শুধু মজুরি দিচ্ছি না, বাসস্থান আর রেশনও দিচ্ছি।" কিন্তু সেই বাসস্থানের অবস্থা দেখলে বোঝা যায় এটা সুবিধা না, এটা বন্দিত্ব।
একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬২% চা শ্রমিক পরিবার একটা মাত্র ঘরে থাকে, গড় সাইজ ১২০ বর্গফুট। ৪৫% পরিবারের কাছে নিরাপদ পানির উৎস নেই। মাত্র ২৮% পরিবারে স্যানিটারি টয়লেট আছে। এটা ২০২৬ সালের বাংলাদেশ, যেখানে জাতীয়ভাবে ৯৯% মানুষের স্যানিটেশন সুবিধা আছে।
পর্ব ৩: চায়ের অর্থনীতি, শ্রমিকের দারিদ্র্য
বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম চা উৎপাদক। প্রতি বছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হয়।
উৎপাদন বাড়ছে। ২০০০ সালে ছিল ৫৭ মিলিয়ন কেজি, ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০২ মিলিয়ন কেজি। প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু এই বাড়তি উৎপাদনের ফল কি শ্রমিকদের কাছে পৌঁছেছে?
একসময় বাংলাদেশ চা রপ্তানি করতো। ১৯৯০ এর দশকে উৎপাদনের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ রপ্তানি হতো। এখন? মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। কারণ দেশের ভেতরে চাহিদা এত দ্রুত বেড়েছে যে উৎপাদন সেই গতিতে পারেনি। বাংলাদেশ এখন আসলে নেট চা আমদানিকারক হতে চলেছে।
এর মানে কী? মানে চা বাগানের মালিকরা এখন মূলত অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি করছে। আর অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম ক্রমশ বাড়ছে, কারণ চাহিদা বেশি, সরবরাহ কম। ২০১৫ সালে নিলামে গড় চায়ের দাম ছিল কেজিপ্রতি ১৮০ টাকা। ২০২৫ সালে সেটা ৩০০ টাকার কাছাকাছি। দাম বেড়েছে ৬৭%। একই সময়ে শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে কত? ১২০ টাকা থেকে ১৭০ টাকা, মানে ৪২%। চায়ের দাম বাড়ে বেশি, শ্রমিকের মজুরি বাড়ে কম।
বাগানগুলোর মালিকানা কাঠামোও বোঝা দরকার। স্বাধীনতার পর ব্রিটিশ "স্টার্লিং" কোম্পানিগুলো চলে গেলে বাগানগুলো বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের হাতে আসে। এখন প্রায় ৯০% বাগান বেসরকারি মালিকানায়। জেমস ফিনলে, ডানকান ব্রাদার্সের মতো কিছু বিদেশি কোম্পানি এখনো আছে, তবে সংখ্যায় কম। বাংলাদেশ চা বোর্ড (বিটিবি) কিছু বাগান সরাসরি পরিচালনা করে। আর ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি) সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কিছু বাগান চালায়। কিন্তু মালিক যেই হোক, শ্রমিকের মজুরি একই: ১৭০ টাকা।
পর্ব ৪: মুদ্রাস্ফীতি খায়, মজুরি বাড়ে না
নামমাত্র মজুরি বৃদ্ধি দেখে প্রতারিত হওয়া সহজ। "১৭০ টাকা তো ২০০০ সালের ২৮ টাকার চেয়ে অনেক বেশি!" কিন্তু প্রকৃত (real) মজুরি হিসাব করলে ছবিটা সম্পূর্ণ বদলে যায়।
মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় করলে দেখা যায়, ২০০০ সালের ২৮ টাকার ক্রয়ক্ষমতা ২০২৫ সালের মূল্যে প্রায় ১৪০ টাকার সমান। আর বর্তমান ১৭০ টাকা? প্রকৃত বৃদ্ধি মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ, ২৫ বছরে। বছরে গড়ে ১ শতাংশেরও কম। মানে চা শ্রমিকের জীবনমান ২৫ বছরে কার্যত স্থির থেকেছে।
এদিকে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি একই সময়ে তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। দেশ ধনী হয়েছে, চা বাগানের মুনাফা বেড়েছে, কিন্তু শ্রমিকরা সেই সমৃদ্ধি থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বাদ পড়েছে।
জাতীয়ভাবে দারিদ্র্যের হার প্রায় ১৮.৭%। কিন্তু চা বাগান এলাকায়? বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশ চা শ্রমিক পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে। হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেটের চা বাগান এলাকাগুলো বাংলাদেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোর মধ্যে। এটা কোনো দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল না। এটা সিলেট বিভাগ, যেখান থেকে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে। অথচ ঠিক সেখানেই, চা বাগানের ভেতরে, মানুষ ১৭০ টাকা দৈনিক মজুরিতে বেঁচে আছে।
পর্ব ৫: পরবর্তী প্রজন্ম, একই শেকল
দারিদ্র্যের সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিক হলো এটা বংশপরম্পরায় চলে। কমলার মেয়ে সুমি (১৪) কি বাগানের বাইরে যেতে পারবে?
জাতীয় সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৫%। চা শ্রমিক পরিবারে? ৩০ থেকে ৩৫%। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার জাতীয়ভাবে ৯৮%। চা বাগান এলাকায়? ৬৫ থেকে ৭০%। আর মাধ্যমিকে? জাতীয় হার ৭২%, চা বাগানে মাত্র ২০ থেকে ২৫%।
বাগানের ভেতরে প্রাথমিক স্কুল আছে, কিন্তু সেগুলোর মান অত্যন্ত খারাপ। শিক্ষক কম, বই কম, অবকাঠামো ভেঙে পড়া। মাধ্যমিক স্কুলে যেতে হলে বাগানের বাইরে যেতে হয়, যাতায়াত খরচ আছে। বেশিরভাগ পরিবার সেই খরচ বহন করতে পারে না। তাই সুমিও সম্ভবত মায়ের পথেই হাঁটবে। ১৫ বা ১৬ বছর বয়সে পাতা তুলতে শুরু করবে। বিয়ে হবে বাগানেরই কোনো ছেলের সাথে। চক্রটা আবার শুরু হবে।
চা বাগানের শ্রমশক্তির প্রায় ৬০ শতাংশ নারী। পাতা তোলার কাজ মূলত নারীরাই করে, কারণ "তাদের হাত ছোট, পাতা তুলতে সুবিধা" বলে একটা পুরনো ধারণা চালু আছে। আসল কারণ: নারী শ্রমিকরা কম দাবি করে, কম প্রতিবাদ করে, আর সংগঠিত হওয়ার সুযোগ কম পায়। স্থায়ী শ্রমিকদের বাইরে বিপুল সংখ্যক ক্যাজুয়াল এবং মৌসুমি শ্রমিক আছে যারা আরো কম পায়, আর কোনো সুবিধা পায় না।
পর্ব ৬: কী করা যেতো, কী করা হয়নি
ভারতের আসামে, যেখানকার চা বাগান বাংলাদেশের মতোই, সেখানেও শ্রমিকদের অবস্থা খারাপ। কিন্তু তবুও আসামের চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ২৩২ ভারতীয় রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩২০ টাকা), বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ। শ্রীলঙ্কায় চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১,৭০০ শ্রীলঙ্কান রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৩০ টাকা)। কেনিয়ায় আরো বেশি।
বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে? কারণ চা শ্রমিকদের জন্য আলাদা ন্যূনতম মজুরি বোর্ড আছে, আর সেই বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রভাব অনেক বেশি। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি আইন চা শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য না। তারা একটা আলাদা, পুরনো, ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামোর অধীনে। "চা শ্রমিক আইন" (Plantations Labour Act এর বাংলাদেশি সংস্করণ) তাদের অধিকার সীমিত রাখে।
কিন্তু বদলানো সম্ভব। কয়েকটা পদক্ষেপ:
প্রথমত, চা শ্রমিকদের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি আইনের আওতায় আনা। কোনো যুক্তিতেই ন্যায্য না যে একজন চা শ্রমিক গার্মেন্টস শ্রমিকের তিনভাগের একভাগেরও কম পাবে।
দ্বিতীয়ত, ভূমি অধিকার। ১৫০ বছর ধরে বাগানে বাস করেও চা শ্রমিকদের জমির মালিকানা নেই। তাদের বাসস্থানের উপর আইনি অধিকার দিতে হবে। জমির মালিকানা মানে মর্যাদা, মানে ব্যাংক ঋণ, মানে বিকল্প আয়ের পথ।
তৃতীয়ত, শিক্ষায় বিনিয়োগ। প্রতিটা চা বাগানে সরকারি মানের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল থাকতে হবে। বৃত্তি দিতে হবে যেন মেধাবী ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষায় যেতে পারে। দারিদ্র্যের চক্র ভাঙতে হলে শিক্ষা ছাড়া বিকল্প নেই।
চতুর্থত, চা শিল্পের আধুনিকায়ন। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, মান উন্নত করতে হবে। "সিলেট টি" কে একটা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বানানো সম্ভব, যেমন শ্রীলঙ্কার "সিলন টি" বা ভারতের "দার্জিলিং টি" বিশ্ববিখ্যাত। তাহলে বেশি দামে চা বিক্রি হবে, আর সেই মুনাফার একটা অংশ শ্রমিকদের কাছে যেতে পারবে।
আসুন শেষ করি যেখান থেকে শুরু করেছিলাম।
কমলা আজ সন্ধ্যায় ফিরবে ক্লান্ত শরীরে। হাতের তালু কাঁচা পাতার রসে সবুজ হয়ে থাকবে। ১৭০ টাকার হিসাবটা মাথায় ঘুরবে। চাল কিনবে না তেল কিনবে, দুটো একসাথে কেনার সামর্থ্য নেই।
আপনি যখন সকালে এক কাপ চা খাবেন, একটু ভাবুন। সেই চায়ের দাম হয়তো ১৫ বা ২০ টাকা। কিন্তু যে নারী ভোর পাঁচটায় উঠে, কুয়াশায় ভিজে, ঘাড়ে ২৩ কেজি পাতার ঝুড়ি বইছে, সে পাচ্ছে দিনে ১৭০ টাকা। ২৫ বছরে তার মজুরি "বেড়েছে," কিন্তু তার জীবন বদলায়নি। তার মেয়ে তার পথেই হাঁটবে। তার নাতনিও হয়তো।
১৫০ বছর আগে ব্রিটিশরা একটা শোষণের কাঠামো তৈরি করেছিল। আমরা সেই কাঠামো ভাঙিনি। রং বদলেছি, মালিকের নাম বদলেছে, কিন্তু শ্রমিকের অবস্থান বদলায়নি। ২০২৬ সালেও কমলা সেই একই চা বাগানে, সেই একই মজুরিতে, সেই একই অন্ধকারে।
এটা দাসত্ব কি না, সেটা আপনিই ঠিক করুন।