সিগারেটে সস্তা, জীবনে দাম
পর্ব ১: ধোঁয়ার দেশ
ঢাকার মিরপুরে চায়ের দোকানে বসে আছেন রফিক মিয়া। বয়স ৪৫। রিকশা চালান। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্যাডেল মারেন। দিনে আয় হয় ৫০০-৬০০ টাকা। চা খেতে খেতে একটা সিগারেট ধরালেন। ব্র্যান্ড? "ডার্বি", সবচেয়ে সস্তা সেগমেন্টের একটা। দাম? মাত্র ৫ টাকা একটা। একটা চায়ের চেয়ে সস্তা।
রফিক মিয়া দিনে ১০-১২টা সিগারেট খান। মাসে খরচ? দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। তার মোট আয়ের প্রায় ১২-১৩%। তিনি জানেন সিগারেট খারাপ। প্যাকেটের গায়ে লেখা আছে "ধূমপান মৃত্যু ঘটায়"। কিন্তু পাঁচ টাকায় একটা সিগারেট পাওয়া যায়, তাহলে ছাড়বে কেন?
এবার একটু ভেবে দেখুন। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশগুলোতে একটা সিগারেটের দাম কত? অস্ট্রেলিয়ায় একটা সিগারেটের দাম প্রায় ২.৫ অস্ট্রেলিয়ান ডলার, মানে প্রায় ১৮০ টাকা। যুক্তরাজ্যে প্রায় ১৫০ টাকা। নিউজিল্যান্ডে ১৭০ টাকা। আর বাংলাদেশে? ৫ টাকা।
এই চার্টটা দেখুন:
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২০ সিগারেটের একটা প্যাকেটের দাম। অস্ট্রেলিয়ায় ৩,৬০০ টাকা। যুক্তরাজ্যে ৩,০০০ টাকা। থাইল্যান্ডে ৫৫০ টাকা। ভারতে ৩৫০ টাকা। আর বাংলাদেশে? সবচেয়ে সস্তা ব্র্যান্ডে ১০০ টাকারও কম। এমনকি মধ্যম সেগমেন্টেও ১৫০-২০০ টাকা।
বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তা সিগারেটের দেশগুলোর একটা। আর এই সস্তা দামের পরিণতি? সাড়ে তিন কোটির বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ধূমপান করে। এটা মোট প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ১৮%। আর শুধু সিগারেট না, বিড়িও আছে। বিড়ি সিগারেটের চেয়েও সস্তা, একটা বিড়ির দাম মাত্র ১-২ টাকা। বিড়িসহ মোট তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪.৬ কোটি।
এই চার্টটা দেখুন:
গত দুই দশকে ধূমপানের হার কিছুটা কমেছে, সেটা সত্য। ২০০৯ সালে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ধোঁয়াযুক্ত তামাক ব্যবহারের হার ছিল প্রায় ২৩%। ২০২৫ সালে সেটা কমে প্রায় ১৮% হয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যা বেড়েছে। তাই হার কমলেও মোট ধূমপায়ীর সংখ্যা খুব একটা কমেনি। আর যেটা ভয়ের, সেটা হলো গরিব মানুষের মধ্যে ধূমপানের হার ধনী মানুষের তুলনায় অনেক বেশি।
সবচেয়ে গরিব ২০% পরিবারে ধূমপানের হার ২৯%। আর সবচেয়ে ধনী ২০% পরিবারে? মাত্র ১০%। মানে যাদের টাকা কম, তারাই বেশি ধূমপান করছে। তারাই সিগারেটের পেছনে আয়ের বড় অংশ ব্যয় করছে। তারাই অসুস্থ হলে চিকিৎসা খরচ জোগাতে পারবে না। এটা দারিদ্র্যের একটা চক্র, তামাক সেই চক্রকে আরো গভীর করছে।
রফিক মিয়ার কথায় ফিরে আসি। তার মাসিক সিগারেট খরচ দেড় হাজার টাকা। বছরে ১৮,০০০ টাকা। এই টাকা দিয়ে তিনি কী করতে পারতেন? তার মেয়ের টিউশন ফি দিতে পারতেন। পরিবারের জন্য একটা স্বাস্থ্যবিমা কিনতে পারতেন। কিন্তু পাঁচ টাকার সিগারেট এত সহজলভ্য যে "ছাড়া" শব্দটাই অর্থহীন মনে হয়।
কিন্তু আসল খরচ তো সিগারেটের দাম না। আসল খরচ আসে পরে। অনেক পরে। যখন ফুসফুস কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
পর্ব ২: রোগের হিসাব
ক্যান্সার হাসপাতালে যান। ঢাকার মহাখালীতে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট। সকাল আটটায় গেলে দেখবেন, লাইন রাস্তায় পড়ে গেছে। শত শত মানুষ। ফুসফুস ক্যান্সার, মুখের ক্যান্সার, গলার ক্যান্সার, মূত্রাশয়ের ক্যান্সার। এদের একটা বড় অংশের অসুখের কারণ একটাই: তামাক।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকজনিত রোগে মারা যায় প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ। দিনে ৪৪০ জন। প্রতি ঘণ্টায় ১৮ জন। আপনি এই লেখাটা পড়তে যত সময় নিচ্ছেন, সেই সময়ে বাংলাদেশে কয়েকজন মানুষ তামাকের কারণে মারা গেছে।
ফুসফুস ক্যান্সার, COPD (ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ), হৃদরোগ, স্ট্রোক, মুখ ও গলার ক্যান্সার। এই পাঁচটা রোগ মিলিয়ে তামাকজনিত মৃত্যুর ৮০% এর বেশি। আর এগুলো শুধু মৃত্যুর হিসাব। যারা মরে না কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় ভোগে, তাদের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বেশি।
এখন এই মৃত্যু আর অসুস্থতার অর্থনৈতিক মূল্য কত? এই চার্টটা দেখুন:
তামাকজনিত স্বাস্থ্য ব্যয় প্রতি বছর প্রায় ৩০,৫০০ কোটি টাকা। এটা সরাসরি চিকিৎসা খরচ, হাসপাতালে ভর্তি, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এর সাথে যোগ করুন উৎপাদনশীলতা হারানোর খরচ, যেমন অসুস্থ হয়ে কাজ করতে না পারা, অকালমৃত্যুতে কর্মবছর হারানো। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ৫০,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
রফিক মিয়ার বছরে ১৮,০০০ টাকার সিগারেটের বিনিময়ে দেশ কী পাচ্ছে? একজন সম্ভাব্য ক্যান্সার রোগী, যার চিকিৎসায় ৫-১০ লাখ টাকা খরচ হবে। একটা পরিবার যা ভেঙে পড়বে। তিনটা সন্তান যারা বাবাকে হারাবে।
আর সবচেয়ে নিষ্ঠুর ব্যাপার হলো, এই ক্ষতি বহন করছে প্রধানত গরিব মানুষ। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৮% আসে পকেট থেকে (out-of-pocket)। সরকারি স্বাস্থ্যবিমা নেই বললেই চলে। ক্যান্সার ধরা পড়লে চিকিৎসা খরচ জোগাতে জমি বিক্রি, ঋণ নেওয়া, সন্তানদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনা, সবকিছু করতে হয়। তামাক শুধু স্বাস্থ্য নষ্ট করে না, পুরো পরিবারকে দারিদ্র্যে ঠেলে দেয়।
কিন্তু একটা প্রশ্ন তো থাকে: সরকার তো তামাক থেকে ট্যাক্স পায়, সেটা দিয়ে কি ক্ষতি পুষিয়ে যায়?
পর্ব ৩: ট্যাক্সের ফাঁকি
বাংলাদেশ সরকার তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় করে প্রায় ৩৫,০০০ কোটি টাকা। সংখ্যাটা বড়। মোট রাজস্বের প্রায় ১০%। সরকারের কাছে এটা একটা সহজ আয়ের উৎস। তামাকে ট্যাক্স বাড়ালে মানুষ প্রতিবাদ করে না (মদে করে), আর কোম্পানিগুলো ট্যাক্স দিতে রাজি থাকে কারণ তাদের মুনাফার হার বিশাল।
কিন্তু এই রাজস্ব আয়ের বিপরীতে স্বাস্থ্য ব্যয় কত? এই চার্টটা দেখুন:
বাম দিকে তামাক রাজস্ব: ৩৫,০০০ কোটি টাকা। ডান দিকে তামাকজনিত স্বাস্থ্য ব্যয়: ৩০,৫০০ কোটি টাকা, সাথে উৎপাদনশীলতা হারানোর অতিরিক্ত খরচ। মোট ক্ষতি? রাজস্ব আয়ের চেয়ে বেশি। মানে সরকার তামাক থেকে যা আয় করছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে জনস্বাস্থ্যে। এটা কোনো লাভজনক ব্যবসা না। এটা ক্ষতিকর ভর্তুকি।
তাহলে ট্যাক্স বাড়ানো হচ্ছে না কেন? কারণ বাংলাদেশে তামাকের কর কাঠামো অত্যন্ত জটিল এবং কোম্পানিদের পক্ষে সাজানো।
অস্ট্রেলিয়ায় সিগারেটের খুচরা মূল্যের ৮২% ট্যাক্স। যুক্তরাজ্যে ৭৭%। থাইল্যান্ডে ৭০%। ভারতে ৫৩%। আর বাংলাদেশে? ওজনভিত্তিক গড় মাত্র ৪৫%। WHO সুপারিশ করে ন্যূনতম ৭৫%। বাংলাদেশ সেই লক্ষ্য থেকে ৩০ শতাংশ পয়েন্ট পিছিয়ে।
আরো খারাপ ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে সিগারেটের চারটা মূল্যস্তর আছে। নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ, আর প্রিমিয়াম। প্রতিটা স্তরে আলাদা ট্যাক্স হার। নিম্ন স্তরে ট্যাক্স সবচেয়ে কম। মানে সবচেয়ে সস্তা সিগারেটে ট্যাক্স সবচেয়ে কম। মানে গরিব মানুষ যে সিগারেট কেনে, সেটায় সরকার সবচেয়ে কম ট্যাক্স নেয়। এটা উল্টো যুক্তি। জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে সবচেয়ে সস্তা সিগারেটে সবচেয়ে বেশি ট্যাক্স থাকা উচিত, যাতে দাম বাড়ে এবং গরিব মানুষ কম কিনে।
কিন্তু তামাক কোম্পানিগুলো এই জটিল কাঠামোটা টিকিয়ে রাখে। তারা লবি করে। তারা বলে, "ট্যাক্স বাড়ালে চোরাচালান বাড়বে।" তারা বলে, "লাখ লাখ কৃষক তামাক চাষ করে, তাদের জীবিকা নষ্ট হবে।" তারা বলে, "আমরা কর্মসংস্থান দিচ্ছি।" এই যুক্তিগুলো কতটা সত্য?
চোরাচালানের ভয়? থাইল্যান্ড ট্যাক্স ৭০% করেও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। চোরাচালান বন্ধ করা সরকারের কাজ, ট্যাক্স কম রাখা সমাধান না।
কৃষকদের জীবিকা? বাংলাদেশে তামাক চাষে আছে প্রায় ১ লাখ পরিবার। তাদের বিকল্প ফসলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব এবং করা উচিত। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে এটা হয়েছে। তামাক চাষিদের সয়াবিন, ভুট্টা, সবজি চাষে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
কর্মসংস্থান? তামাক কোম্পানি বাংলাদেশে প্রায় ৫০,০০০ জনকে সরাসরি কাজ দেয়। কিন্তু তামাকজনিত রোগে প্রতি বছর ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ মারা যায়। ৫০,০০০ চাকরি বনাম ১,৬১,০০০ মৃত্যু। এই হিসাবে কোনো কোম্পানির পক্ষে যুক্তি দেওয়া কঠিন।
আর সিগারেটের বাইরেও আরেকটা বিশাল সমস্যা আছে যেটা প্রায় কেউ বলে না: বিড়ি।
পর্ব ৪: বিড়ির অন্ধকার
বিড়ি বাংলাদেশের তামাক বাজারের সবচেয়ে অবহেলিত এবং সবচেয়ে ক্ষতিকর অংশ। সিগারেট নিয়ে কথা হয়, বিড়ি নিয়ে কেউ কথা বলে না। কিন্তু সংখ্যাটা দেখুন।
বাংলাদেশের তামাক বাজারে বিড়ি এবং জর্দা-গুলসহ ধোঁয়াবিহীন তামাকের অংশ বিশাল। সিগারেট বাজারের সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশ হলেও, মোট তামাক ব্যবহারকারীর একটা বড় অংশ বিড়ি ও জর্দা ব্যবহার করে। গ্রামে, নির্মাণ শ্রমিকদের মধ্যে, কৃষকদের মধ্যে বিড়ি অনেক বেশি জনপ্রিয়।
একটা বিড়ি কেন বেশি ক্ষতিকর? বিড়িতে ফিল্টার নেই। ধোঁয়া সরাসরি ফুসফুসে যায়। তেঁদু পাতায় মোড়ানো, পোড়ালে কার্বন মনোক্সাইড বেশি উৎপন্ন হয়। গবেষণা বলছে, একটা বিড়ি একটা সিগারেটের চেয়ে তিন গুণ বেশি কার্বন মনোক্সাইড এবং পাঁচ গুণ বেশি টার দেয়। মানে বিড়ি সস্তা, কিন্তু বেশি ক্ষতিকর।
আর বিড়িতে ট্যাক্স? প্রায় নেই বললেই চলে। সিগারেটে যতটুকু ট্যাক্স আছে, বিড়িতে তার ভগ্নাংশ। বিড়ি কোম্পানিগুলো বেশিরভাগ অসংগঠিত খাতে, ট্যাক্স নেট-এর বাইরে। সরকার বিড়িতে ট্যাক্স বাড়াতে চায় না কারণ "গরিবের ধূমপান" নিয়ে কথা বলা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল।
কিন্তু এই "গরিবের ধূমপান"-ই গরিবকে আরো গরিব করছে। একজন দিনমজুর যে দিনে ৪০০ টাকা আয় করে, সে যদি দিনে ৫০ টাকার বিড়ি খায়, তাহলে তার আয়ের ১২.৫% চলে যাচ্ছে তামাকে। আর পাঁচ-দশ বছর পরে যখন COPD ধরা পড়বে, সে আর কাজ করতে পারবে না। পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে।
আর তামাক কোম্পানিগুলো কি চুপচাপ বসে আছে? না। তারা আক্রমণাত্মকভাবে বিজ্ঞাপন চালাচ্ছে, বিশেষ করে তরুণদের লক্ষ্য করে।
বাংলাদেশে ২০০৫ সালে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন হয়েছে, ২০১৩ সালে সংশোধিত হয়েছে। সরাসরি বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ। কিন্তু পয়েন্ট-অব-সেল ডিসপ্লে, ব্র্যান্ড স্ট্রেচিং, CSR কার্যক্রমের আড়ালে প্রচারণা, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রভাবক বিপণন, এগুলো চলছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং-এর প্রচলন বাড়ছে, যেটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
তাহলে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে? সস্তা সিগারেট, আরো সস্তা বিড়ি, দুর্বল ট্যাক্স, অকার্যকর আইন, আক্রমণাত্মক কোম্পানি। এই সমীকরণে ক্ষতি একটাই পক্ষের: জনগণের।
কিন্তু যদি আমরা চাইতাম, অন্যরকম হতে পারতো। অন্য দেশেরা দেখিয়েছে, তামাক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এবং লাভজনক।
পর্ব ৫: অন্যরা কী করেছে
থাইল্যান্ড। ১৯৯০-এর দশকে থাইল্যান্ডে ধূমপানের হার ছিল প্রায় ৩২%। আজ সেটা ১৮%-এর নিচে। কীভাবে?
প্রথমত, ট্যাক্স বাড়িয়েছে ধাপে ধাপে। ১৯৯৩ সালে তামাকের ওপর ট্যাক্স ছিল ৫৫%। আজ ৭০%। প্রতি বছর সামান্য বাড়ানো হয়েছে, কোম্পানি বা ভোক্তা কেউ হঠাৎ ধাক্কা খায়নি। ট্যাক্স থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত রাজস্ব দিয়ে ThaiHealth Promotion Foundation তৈরি করা হয়েছে, যেটা তামাক নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা, আর ধূমপান ছাড়ানো কর্মসূচিতে অর্থায়ন করে।
দ্বিতীয়ত, সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা। প্যাকেটের ৮৫% জুড়ে ক্যান্সারাক্রান্ত ফুসফুসের ছবি। বাংলাদেশে? মাত্র ৫০%। আর ছবির মান এমন যে মানুষ পাত্তা দেয় না।
তৃতীয়ত, পাবলিক প্লেসে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়। জরিমানা কড়া। বাংলাদেশে আইন আছে, প্রয়োগ নেই। রেস্টুরেন্টে, বাসে, অফিসে, সবখানে ধূমপান চলে।
অস্ট্রেলিয়ার কথা বলি। অস্ট্রেলিয়া পৃথিবীর প্রথম দেশ যেটা ২০১২ সালে "প্লেইন প্যাকেজিং" চালু করেছে। সিগারেটের প্যাকেটে কোনো ব্র্যান্ড লোগো, রঙ, ডিজাইন নেই। সব প্যাকেট একই রকম, গাঢ় বাদামি-সবুজ, শুধু ভয়াবহ স্বাস্থ্য সতর্কতার ছবি। ফল? ধূমপানের হার ২০১২ সালে ছিল ১৫.১%, ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ৮.৩%-এ।
ভারতও এগিয়েছে। ২০১৭ সালে GST-র আওতায় তামাকে উচ্চ সেস (cess) আরোপ করা হয়েছে। বিড়িতেও ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে, যদিও পর্যাপ্ত না। কিন্তু অন্তত দিকটা ঠিক আছে।
আর বাংলাদেশ? বাংলাদেশ WHO FCTC (Framework Convention on Tobacco Control) অনুসমর্থন করেছে ২০০৪ সালে। কিন্তু FCTC-র প্রধান সুপারিশগুলোর কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে? ট্যাক্স ৭৫% করার কথা, হয়নি। সচিত্র সতর্কবার্তা ৮৫% করার কথা, হয়নি। সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন নিষেধাজ্ঞা, হয়নি। ধূমপানমুক্ত পাবলিক প্লেস, হয়নি।
কেন হয়নি? দুটো কারণ। এক, তামাক কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (BATB) দেশের সবচেয়ে লাভজনক কোম্পানিগুলোর একটা। তাদের লবিং শক্তি বিশাল। দুই, সরকারের রাজস্ব নির্ভরতা। তামাক থেকে ৩৫,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব আসে, সরকার সেটা হারাতে চায় না।
কিন্তু ট্যাক্স বাড়ালে রাজস্ব কমে না, বাড়ে। এটা প্রমাণিত। দাম বাড়লে ব্যবহার কমে, কিন্তু ট্যাক্সের হার বেশি হওয়ায় মোট রাজস্ব বাড়ে। WHO-র গবেষণা বলছে, দাম ১০% বাড়ালে ব্যবহার ৪-৫% কমে, কিন্তু রাজস্ব ৫-৬% বাড়ে।
ট্যাক্স বাড়ানো হলে একই সাথে দুটো জিনিস হবে: মানুষ কম সিগারেট খাবে (জনস্বাস্থ্যে লাভ), আর সরকারের রাজস্ব বাড়বে (অর্থনৈতিক লাভ)। এটা সেই বিরল নীতি যেখানে স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতি দুটোই জেতে।
পর্ব ৬: পাঁচ টাকার প্রশ্ন
আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।
রফিক মিয়া মিরপুরের চায়ের দোকানে বসে পাঁচ টাকার সিগারেট ধরাচ্ছেন। এটা তার অধিকার, কেউ জোর করে ছাড়াতে পারে না এবং ছাড়ানো উচিতও না। কিন্তু প্রশ্ন হলো: এই পাঁচ টাকার সিগারেটটা কি তার আসল দামে বিক্রি হচ্ছে?
উত্তর: না। এই সিগারেটের আসল দামে তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি, তার পরিবারের ভবিষ্যৎ খরচ, আর দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার বোঝা, কিছুই হিসাবে নেই। ৫ টাকায় সিগারেট বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু দেশ দাম দিচ্ছে ৩০,৫০০ কোটি টাকা। প্রতি বছর।
বাংলাদেশের সামনে দুটো পথ আছে।
এক: কিছু না করা। সিগারেট সস্তা থাকবে। ৩.৫ কোটি মানুষ ধূমপান করতে থাকবে। প্রতি বছর ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ মারা যাবে। স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়তে থাকবে। গরিব পরিবারগুলো আরো গরিব হবে। তামাক কোম্পানিগুলো মুনাফা করতে থাকবে।
দুই: পদক্ষেপ নেওয়া। ট্যাক্স ধাপে ধাপে ৭৫%-এ নিয়ে যাওয়া। বহু-স্তর মূল্য কাঠামো বাতিল করে একক সুনির্দিষ্ট কর (specific tax) চালু করা। বিড়িতে ট্যাক্স বাড়ানো। সচিত্র সতর্কবার্তা ৮৫%-এ উন্নীত করা। ধূমপানমুক্ত আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা। অতিরিক্ত রাজস্ব দিয়ে ThaiHealth-এর মতো স্বাস্থ্য উন্নয়ন তহবিল তৈরি করা। তামাক চাষিদের বিকল্প ফসলে নিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি চালু করা।
দ্বিতীয় পথ কঠিন। তামাক কোম্পানির লবি শক্তিশালী। রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। কিন্তু থাইল্যান্ড পেরেছে, অস্ট্রেলিয়া পেরেছে, ভারত চেষ্টা করছে।
প্রতি ঘণ্টায় ১৮ জন বাংলাদেশি তামাকে মারা যাচ্ছে। তাদের বেশিরভাগ গরিব। তাদের বেশিরভাগ জানে না যে পাঁচ টাকার সিগারেটের আসল দাম অনেক, অনেক বেশি।
রফিক মিয়ার কাছে সিগারেট সস্তা। কিন্তু তার জীবনের দাম? সেটা কেউ হিসাব করে না।