কোচিং সেন্টার: শিক্ষার সমান্তরাল অর্থনীতি
পর্ব ১: স্কুলের পরে আসল স্কুল
রাত ৯টা। ঢাকার মিরপুরে একটা ছোট ফ্ল্যাটে নবম শ্রেণির ছাত্রী রিমা বসে আছে। সকাল ৭টায় স্কুল শুরু হয়েছিল। দুপুর ১টায় শেষ। তারপর বাসায় এসে তাড়াতাড়ি ভাত খেয়ে ৩টায় গণিতের প্রাইভেট। ৫টায় ইংরেজির কোচিং। ৭টায় ফিজিক্সের ব্যাচ। এখন রাত ৯টায় বাসায় ফিরে হোমওয়ার্ক করছে।
রিমার দিন কতটা লম্বা? প্রায় ১৪ ঘণ্টা পড়াশোনা সংশ্লিষ্ট কাজ। একটা গার্মেন্টস শ্রমিকও এত ঘণ্টা কাজ করে না।
রিমার বাবা একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে অ্যাকাউন্টস অফিসার। মাসিক আয় ৩৫,০০০ টাকা। রিমার তিনটা প্রাইভেট আর কোচিংয়ের পেছনে মাসে খরচ হচ্ছে ১২,০০০ টাকা। মানে বাবার আয়ের এক-তৃতীয়াংশের বেশি। রিমার ছোট ভাইও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। তার জন্য আরো ৬,০০০ টাকা। দুই সন্তানের টিউশন খরচ মিলিয়ে ১৮,০০০ টাকা। বাবার আয়ের অর্ধেকের বেশি।
রিমার বাবা কেন এত খরচ করছেন? কারণ স্কুলে রিমা যা শিখছে, সেটা পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য যথেষ্ট না। ক্লাসে ৬০-৭০ জন ছাত্রছাত্রী। শিক্ষক ৪০ মিনিটে সিলেবাস শেষ করার চেষ্টা করেন। কে বুঝলো, কে বুঝলো না, সেটা দেখার সময় নেই। পরীক্ষায় ভালো করতে হলে বাইরে পড়তে হবে। এটা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অলিখিত নিয়ম।
এবার জুম আউট করুন। রিমার মতো বাংলাদেশে কতজন ছাত্রছাত্রী প্রাইভেট টিউশন নিচ্ছে?
বাংলাদেশে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ৮০% এর বেশি শিক্ষার্থী কোনো না কোনো ধরনের প্রাইভেট টিউশন বা কোচিং নেয়। মাধ্যমিক স্তরে এই হার ৮৭%। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৯২%। মানে, যে শিশু প্রাইভেট পড়ে না, সে ব্যতিক্রম। প্রাইভেট না পড়াটাই অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ৮০%+ শিক্ষার্থীর পরিবার প্রতি মাসে কত খরচ করছে? সব মিলিয়ে এই বাজারটা কত বড়? সেটা দেখলে চমকে যাবেন।
বাংলাদেশের ছায়া শিক্ষা বাজার (shadow education market) এর আনুমানিক আকার ৩০,০০০ কোটি টাকা। কিছু হিসাবে এটা ৩৫,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত। তুলনা করুন: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেট ছিল প্রায় ৮৮,০০০ কোটি টাকা। মানে পরিবারগুলো নিজেদের পকেট থেকে সরকারি শিক্ষা বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খরচ করছে শুধু প্রাইভেট টিউশনে। এটা কোনো ছোট খাত না। এটা একটা সমান্তরাল অর্থনীতি।
কিন্তু এই ৩০,০০০ কোটি টাকা কে খরচ করছে? সবাই কি সমানভাবে? মোটেও না।
পর্ব ২: টাকা যার, শিক্ষা তার
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় মিথ হলো এটা "সবার জন্য"। সরকারি স্কুলে পড়া ফ্রি, বই ফ্রি, অনেক জায়গায় উপবৃত্তিও আছে। কাগজে-কলমে সবকিছু সুন্দর। কিন্তু বাস্তবে? স্কুলে পড়ে পরীক্ষায় ভালো করা সম্ভব না, আর ভালো করতে হলে টিউশন লাগবে, আর টিউশনের জন্য টাকা লাগবে।
এবার এই চার্টটা দেখুন:
আয়ের ভিত্তিতে পরিবারগুলোকে পাঁচ ভাগে ভাগ করলে ছবিটা স্পষ্ট হয়ে যায়। সবচেয়ে ধনী ২০% পরিবার প্রতি সন্তানের টিউশনে মাসে গড়ে ৫,০০০-৮,০০০ টাকা খরচ করে। সবচেয়ে গরিব ২০%? মাসে ৫০০-৮০০ টাকা। কখনো শূন্য। তারা চাইলেও পারে না।
পার্থক্যটা শুধু টাকার না। ধনী পরিবারের সন্তান নামি কোচিং সেন্টারে পড়ে, অভিজ্ঞ শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ে, অনলাইন কোর্স কেনে। গরিব পরিবারের সন্তান? যদি ভাগ্য ভালো হয়, গ্রামের কোনো এসএসসি পাশ ছেলের কাছে মাসে ২০০ টাকায় পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো সাহায্যই পায় না।
ফলাফল? পরীক্ষায় গরিব পরিবারের সন্তানেরা পিছিয়ে পড়ে। ভালো স্কুলে ভর্তি হতে পারে না। ভালো কলেজে সুযোগ পায় না। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারে না। বৃত্তি পায় না। চক্র সম্পূর্ণ হয়। দারিদ্র্য থেকে বের হওয়ার যে সিঁড়ি শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল, সেই সিঁড়িতেই এখন টোল দিতে হচ্ছে। আর টোলের টাকা যার নেই, তার জন্য সিঁড়িটা বন্ধ।
আর এই বৈষম্যের সবচেয়ে বড় মাত্রা হলো শহর আর গ্রামের ব্যবধান।
ঢাকায় একজন শিক্ষার্থীর গড় টিউশন খরচ গ্রামের তুলনায় ৪-৫ গুণ বেশি। কিন্তু শুধু খরচের তফাত না। ঢাকায় বিখ্যাত কোচিং সেন্টার আছে, প্রশিক্ষিত শিক্ষক আছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সহজলভ্য। গ্রামে? একজন স্থানীয় শিক্ষক হয়তো ১০-১৫ জন ছাত্রকে নিয়ে বাড়ির বারান্দায় পড়ান। মানের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বিভাগীয় শহরগুলোতে অবস্থা ঢাকার চেয়ে কিছুটা খারাপ, কিন্তু গ্রামের চেয়ে অনেক ভালো। গ্রামের শিক্ষার্থীরা একটা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে বেড়ে উঠছে, শিক্ষার ক্ষেত্রে।
তাহলে প্রশ্ন: স্কুলের শিক্ষকরা কেন ক্লাসে ঠিকমতো পড়াচ্ছেন না? কেন বাইরে পড়াতে হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে একটা অস্বস্তিকর সত্য বেরিয়ে আসে।
পর্ব ৩: শিক্ষক, নাকি ব্যবসায়ী?
বাংলাদেশে একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের শুরুর বেতন প্রায় ১৬,০০০-১৮,০০০ টাকা। মাধ্যমিকে? ২২,০০০-২৫,০০০ টাকা। ঢাকায় বাসা ভাড়া ১২,০০০-১৫,০০০ টাকা। বাকি টাকায় খাওয়া, পরিবহন, সন্তানের খরচ, সব চালানো কঠিন। একজন শিক্ষকের পরিবার চালানোর জন্য অতিরিক্ত আয়ের দরকার। আর সবচেয়ে সহজ অতিরিক্ত আয়ের উৎস? প্রাইভেট টিউশন।
একটা গবেষণায় দেখা গেছে, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের মোট আয়ের ৪০-৬০% আসে প্রাইভেট টিউশন থেকে। কোনো কোনো শিক্ষকের ক্ষেত্রে এটা ৭০% পর্যন্ত। মানে সরকারি বেতন তাদের আয়ের ছোট অংশ। আসল আয় টিউশনে।
এখন চিন্তা করুন। একজন শিক্ষক যদি ক্লাসে পুরো সিলেবাস ভালোভাবে পড়িয়ে দেন, ছাত্রছাত্রীরা সব বুঝে ফেলে, তাহলে প্রাইভেটে আসবে কেন? শিক্ষকের আয় কমবে। এটা একটা ভয়ংকর incentive problem. ব্যবস্থাটা এমনভাবে তৈরি হয়ে গেছে যে শিক্ষকের আর্থিক স্বার্থ আর ছাত্রের শিক্ষাগত স্বার্থ পরস্পরবিরোধী।
আমি বলছি না সব শিক্ষক ইচ্ছাকৃতভাবে খারাপ পড়ান। বেশিরভাগ শিক্ষক সৎ, পরিশ্রমী মানুষ। কিন্তু ব্যবস্থাটা তাদের একটা অসম্ভব অবস্থানে ফেলে দিয়েছে। বেতন দিয়ে সংসার চলে না, টিউশন ছাড়া উপায় নেই, আবার টিউশন করলে ক্লাসে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব না। এই দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়ার পথ কেউ দেখাচ্ছে না।
আর এই দুষ্টচক্রের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলো কোচিং সেন্টার ইন্ডাস্ট্রি।
বাংলাদেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত কোচিং সেন্টারের সংখ্যা গত দুই দশকে বিস্ফোরিত হয়েছে। ঢাকার ফার্মগেট, মতিঝিল, উত্তরা, মিরপুর, এসব এলাকায় প্রতিটা বিল্ডিংয়ে কোচিং সেন্টার আছে। কিছু কোচিং সেন্টারের ব্যাচে ২০০-৩০০ ছাত্র। একটা ব্যাচে প্রতি ছাত্র ১,৫০০-৩,০০০ টাকা দেয়। মাসে একটা ব্যাচ থেকে আয় ৩-৯ লাখ টাকা। কিছু নামি কোচিং সেন্টারের মালিকদের মাসিক আয় ১০-২০ লাখ টাকা।
এটা একটা বিশাল ব্যবসা। আর এই ব্যবসা টিকে আছে একটাই কারণে: স্কুল ব্যবস্থা কাজ করছে না। স্কুল যদি ঠিকমতো কাজ করতো, কোচিং সেন্টারের কোনো দরকার হতো না।
কিন্তু একটা মুহূর্ত থামুন। ছাত্রছাত্রীরা কি আসলেই এত ঘণ্টা পড়ছে? তাদের দিনটা কেমন কাটছে?
বাংলাদেশে একজন মাধ্যমিক ছাত্রের দিনের গড় পড়াশোনার সময় (স্কুল + কোচিং + প্রাইভেট + হোমওয়ার্ক) প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা। তুলনা করুন: ফিনল্যান্ডে স্কুলের সময় দিনে ৫ ঘণ্টা, বাড়ির কাজ প্রায় নেই। হোমওয়ার্ক গড়ে ৩০ মিনিট। অথচ ফিনল্যান্ড PISA টেস্টে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটা। বাংলাদেশ? PISA তে অংশই নেয় না, কারণ ফলাফল লজ্জাজনক হবে বলে আশঙ্কা।
বেশি ঘণ্টা পড়া মানে বেশি শেখা না। গবেষণা বার বার দেখিয়েছে, ক্লান্ত মস্তিষ্কে শেখার ক্ষমতা কমে যায়। রিমা দিনে ১৪ ঘণ্টা পড়ছে, কিন্তু ফিনল্যান্ডের একজন ছাত্র ৫ ঘণ্টায় যা শিখছে, রিমা ১৪ ঘণ্টায়ও তা শিখতে পারছে না। কারণ পদ্ধতিটাই ভুল। মুখস্থবিদ্যা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা, সৃজনশীলতার অভাব।
আমরা আমাদের শিশুদের একটা মেশিনে পরিণত করেছি। সকালে স্কুল, বিকেলে কোচিং, সন্ধ্যায় প্রাইভেট, রাতে হোমওয়ার্ক। খেলার সময় নেই, বন্ধুদের সাথে আড্ডা নেই, শৈশব নেই। আর এই সবকিছুর উদ্দেশ্য একটাই: পরীক্ষায় GPA-5।
পর্ব ৪: বাংলাদেশ একা না
বাংলাদেশের ছায়া শিক্ষা সমস্যা অনন্য না। এশিয়ার অনেক দেশেই এই সমস্যা আছে। কিন্তু কোন দেশ কীভাবে এটা সামলাচ্ছে, সেটা দেখলে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা আছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় ছায়া শিক্ষার হার বাংলাদেশের চেয়েও বেশি, প্রায় ৮৫-৯০%। তাদের "হাগওন" (hagwon) সংস্কৃতি বিশ্বখ্যাত। একটা কোরিয়ান পরিবার গড়ে তাদের আয়ের ১০-১৫% শুধু হাগওনে খরচ করে। জাপানেও "জুকু" (juku) সংস্কৃতি প্রবল, প্রায় ৭০% শিক্ষার্থী অংশ নেয়। ভারতে কোটা কোচিং ইন্ডাস্ট্রি, বিশেষ করে রাজস্থানের কোটা শহরের কোচিং মেগা-ইন্ডাস্ট্রি, একটা আলাদা জগৎ।
কিন্তু পার্থক্য হলো: কোরিয়া আর জাপান সমস্যাটা চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নিয়েছে। কোরিয়ায় ২০০০-এর দশকে সরকার হাগওনের সন্ধ্যা ১০টার পরে ক্লাস নেওয়া নিষিদ্ধ করেছে। "curfew on cram schools"। জাপানে স্কুল ব্যবস্থার মান এত উন্নত করা হয়েছে যে জুকুর উপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমছে।
বাংলাদেশ? ২০১২ সালে সরকার কোচিং সেন্টার বন্ধের নীতিমালা করেছিল। শিক্ষকদের নিজ ছাত্রদের প্রাইভেট পড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বাস্তবে? কিছুই বদলায়নি। কোচিং সেন্টার আগের চেয়ে বেড়েছে। শিক্ষকরা আগের মতোই প্রাইভেট পড়াচ্ছেন। নীতিমালা কাগজে আছে, বাস্তবায়ন শূন্য।
কেন বাস্তবায়ন হয়নি? কারণ মূল কারণগুলো সমাধান না করে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কিছু হয় না। শিক্ষকের বেতন বাড়েনি। ক্লাসে ছাত্র সংখ্যা কমেনি। পরীক্ষা ব্যবস্থা বদলায়নি। মূল্যায়ন পদ্ধতি মুখস্থনির্ভরই আছে। যতদিন এসব বদলাবে না, ততদিন কোচিং বন্ধ হবে না।
এবার দেখা যাক, কোন বিষয়ে টিউশনের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
গণিত সবার আগে। তারপর ইংরেজি। তারপর বিজ্ঞান (পদার্থ, রসায়ন, জীববিদ্যা)। এই তিনটা বিষয়ে টিউশনের চাহিদা সবচেয়ে বেশি কারণ এগুলো "কঠিন" বিষয় হিসেবে পরিচিত, আর পরীক্ষায় এগুলোতেই বেশি নম্বর হারায় শিক্ষার্থীরা।
কিন্তু কেন এই বিষয়গুলো "কঠিন"? কারণ স্কুলে এগুলো ঠিকমতো পড়ানো হচ্ছে না। গণিত শেখাতে হলে প্র্যাকটিস দরকার, ধাপে ধাপে বোঝাতে হয়, প্রতিটা ছাত্রের দুর্বলতা আলাদাভাবে সমাধান করতে হয়। ৬০-৭০ জনের ক্লাসে সেটা অসম্ভব। ইংরেজি শেখাতে হলে কথা বলার অভ্যাস দরকার। ক্লাসে ৬৫ জনের সাথে ইংরেজিতে কথা বলার সুযোগ কোথায়?
ব্যবস্থাটা তৈরিই হয়েছে ব্যর্থ হওয়ার জন্য। আর ব্যর্থতার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়েছে কোচিং ইন্ডাস্ট্রি।
পর্ব ৫: টিউশন কি আসলেই কাজ করে?
এই পর্যন্ত পড়ে আপনি হয়তো ভাবছেন: "ঠিক আছে, টিউশনে অনেক টাকা যাচ্ছে, বৈষম্য বাড়ছে, শিশুদের চাপ বাড়ছে। কিন্তু টিউশন কি অন্তত ফলাফল ভালো করছে? যদি করে, তাহলে তো কিছু লাভ হচ্ছে।"
গবেষণার ফলাফল মিশ্র। কিছু গবেষণা দেখায় যে প্রাইভেট টিউশন পরীক্ষার নম্বর ৫-১৫% বাড়ায়। কিন্তু এখানে একটা বড় ক্যাচ আছে। যারা টিউশন নেয়, তারা সাধারণত ধনী পরিবারের সন্তান। ধনী পরিবারে শিক্ষার পরিবেশ ভালো, বই আছে, ইন্টারনেট আছে, অভিভাবকরা শিক্ষিত। তাহলে নম্বর বাড়ার কারণ কি টিউশন, নাকি পারিবারিক পরিবেশ? এটা আলাদা করা কঠিন।
তবে একটা জিনিস স্পষ্ট: টিউশন "প্রকৃত শিক্ষা" বাড়ায় না। পরীক্ষার নম্বর আর প্রকৃত দক্ষতা এক জিনিস না। কোচিং সেন্টারে পড়ানো হয় পরীক্ষার প্রশ্ন অনুমান করা, শর্টকাট মুখস্থ করা, মডেল উত্তর মুখস্থ করা। এটা শিক্ষা না, এটা পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি। দুটো আলাদা জিনিস।
ফলাফল? একজন ছাত্র GPA-5 পায়, কিন্তু ইংরেজিতে একটা অনুচ্ছেদ লিখতে পারে না। গণিতে A+ পায়, কিন্তু বাস্তব জীবনে একটা সুদ-আসলের হিসাব করতে পারে না। সার্টিফিকেটে নম্বর আছে, মাথায় জ্ঞান নেই।
এটা একটা জাতীয় সমস্যা। আমরা একটা প্রজন্ম তৈরি করছি যারা পরীক্ষায় পাশ করতে পারে কিন্তু সমস্যা সমাধান করতে পারে না। যারা মুখস্থ বলতে পারে কিন্তু চিন্তা করতে পারে না। যাদের সার্টিফিকেট আছে কিন্তু দক্ষতা নেই।
পর্ব ৬: সমাধান কি সম্ভব?
সমস্যাটা জটিল, কিন্তু সমাধানের পথ আছে। অন্য দেশেরা এই পথে হেঁটেছে, বাংলাদেশও পারে।
প্রথম পদক্ষেপ: শিক্ষকের বেতন দ্বিগুণ করুন, শর্ত সাপেক্ষে।
বেতন বাড়ানোর সাথে দুটো শর্ত থাকবে। এক, নিজ ছাত্রদের প্রাইভেট পড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং লঙ্ঘনে বরখাস্ত। দুই, ক্লাসে পারফরম্যান্স মূল্যায়ন, শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে না, ছাত্রদের প্রকৃত শিখন দক্ষতা দিয়ে। কোরিয়া এই মডেল ব্যবহার করেছে। শিক্ষকের বেতন বাড়িয়ে পেশাটাকে আকর্ষণীয় করেছে, একই সাথে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছে।
খরচ কত? বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ সরকারি শিক্ষক আছে। সবার বেতন দ্বিগুণ করলে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ২০,০০০-২৫,০০০ কোটি টাকা। এটা অনেক টাকা। কিন্তু পরিবারগুলো ইতিমধ্যে টিউশনে ৩০,০০০ কোটি টাকা খরচ করছে। যদি স্কুল ঠিকমতো কাজ করে আর টিউশনের প্রয়োজন কমে, পরিবারের সেই ৩০,০০০ কোটি টাকা বেঁচে যাবে। নেট হিসাবে দেশ লাভবান হবে।
দ্বিতীয় পদক্ষেপ: ক্লাসের আকার ৩০ জনে নামিয়ে আনুন।
৬০-৭০ জনের ক্লাসে শিক্ষা হয় না। এটা লেকচার হয়, শিক্ষা হয় না। ক্লাসের আকার ৩০ জনে নামাতে হলে দ্বিগুণ শিক্ষক দরকার, দ্বিগুণ ক্লাসরুম দরকার। এটা একদিনে হবে না, ১০ বছরের পরিকল্পনা লাগবে। কিন্তু শুরু তো করতে হবে।
তৃতীয় পদক্ষেপ: পরীক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন করুন।
যতদিন GPA-5 ই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি, ততদিন কোচিং থাকবে। পরীক্ষায় মুখস্থবিদ্যার বদলে সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা পরীক্ষা করতে হবে। এমন প্রশ্ন করতে হবে যা মুখস্থ করে উত্তর দেওয়া যায় না। কোচিং সেন্টার তখন আর "শর্টকাট" বিক্রি করতে পারবে না।
ফিনল্যান্ড এটাই করেছে। তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্ট্যান্ডার্ডাইজড টেস্ট প্রায় নেই। শিক্ষকরা নিজেরাই ছাত্রদের মূল্যায়ন করেন। ফোকাস হলো শেখার উপর, নম্বরের উপর না।
রিমার কথা মনে আছে? মিরপুরের সেই নবম শ্রেণির ছাত্রী? দিনে ১৪ ঘণ্টা পড়ে, বাবার আয়ের অর্ধেকের বেশি যায় টিউশনে। কল্পনা করুন একটা বাংলাদেশ যেখানে রিমার স্কুলেই ভালো শিক্ষক আছে, ক্লাসে ৩০ জন ছাত্রী, শিক্ষক সবার দিকে আলাদা করে নজর দিতে পারেন। রিমার বাবার টিউশনের ১৮,০০০ টাকা বেঁচে যায়। রিমা বিকেলে খেলতে পারে, বই পড়তে পারে, শৈশবটা উপভোগ করতে পারে।
এটা অসম্ভব কল্পনা? ফিনল্যান্ড পারলে, কোরিয়া পদক্ষেপ নিতে পারলে, বাংলাদেশ কেন পারবে না?
৩০,০০০ কোটি টাকার একটা সমান্তরাল অর্থনীতি চলছে আমাদের সন্তানদের শৈশব আর পরিবারের সঞ্চয় গ্রাস করে। এই অর্থনীতির সবচেয়ে দুঃখের দিক হলো, এটার কোনো দরকারই ছিল না। যদি আমরা আমাদের স্কুলগুলোকে ঠিক করতাম, শিক্ষকদের সম্মান আর সম্মানী দুটোই দিতাম, আর পরীক্ষা ব্যবস্থাকে মুখস্থবিদ্যার কবর থেকে তুলে আনতাম।
কোচিং সেন্টার বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার রোগ না। কোচিং সেন্টার হলো রোগের লক্ষণ। রোগটা হলো একটা শিক্ষা ব্যবস্থা যেটা নিজের কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে। লক্ষণ দূর করতে চাইলে রোগ সারাতে হবে।