Back to publications
Narrative 2026-03-06

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে, টাকা নেই

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে, টাকা নেই

পর্ব ১: একটা হিসাব, শূন্য টাকা

কুমিল্লার দেবিদ্বারে রাবেয়া বেগমের বয়স ৪২। স্বামী রিকশা চালায়। তিন মেয়ে। বড় মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। সরকার বলেছে উপবৃত্তির টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আসবে। তাই রাবেয়া সোনালী ব্যাংকে গেলেন। লাইনে দাঁড়ালেন তিন ঘণ্টা। ফর্ম ভরলেন (লেখাপড়া জানেন না, পাশের লোককে দিয়ে ভরালেন)। এনআইডি দিলেন, ছবি দিলেন, স্বাক্ষর দিলেন। অ্যাকাউন্ট খুলে পেলেন।

তারপর? প্রতি তিন মাসে ৭৫০ টাকা আসে। রাবেয়া সাথে সাথে পুরোটা তুলে নেন। অ্যাকাউন্টে এক টাকাও থাকে না। তুলতে গেলেও ঝামেলা। ব্যাংক শহরে, বাড়ি থেকে বাসে যেতে ৫০ টাকা ভাড়া। অর্ধেক দিন নষ্ট। তাই অনেক সময় দালালকে ১০০ টাকা দিয়ে টাকা তুলিয়ে আনেন।

কারণ বাংলাদেশে একজন নারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে প্রথম প্রশ্ন: "আপনার স্বামীর নাম কী?" এনআইডি আছে, কিন্তু অনেক নারীর ঠিকানা স্বামীর বাড়ি, নিজের নামে কোনো ঠিকানা নেই।
প্রায় ৩.৫ কোটি মানুষ
একটা অসুখে সব শেষ
৫০ লাখ মানুষ
আসল অন্তর্ভুক্তি কেমন হয়
৫০-৬০%
সংখ্যার খেলা

রাবেয়ার অ্যাকাউন্ট আছে। সরকারের হিসাবে তিনি "আর্থিকভাবে অন্তর্ভুক্ত"। বিশ্বব্যাংকের ডাটাবেসে তিনি সেই ৫৩% বাংলাদেশির মধ্যে যাদের আর্থিক অ্যাকাউন্ট আছে।

কিন্তু রাবেয়ার জীবনে কি কিছু বদলেছে? না। তিনি এখনো মহাজনের কাছ থেকে ধার নেন ৬০% সুদে। মেয়ের অসুখ হলে গয়না বন্ধক রাখেন। ধানের মৌসুমে আগাম বিক্রি করেন কম দামে, কারণ নগদ দরকার। বিমা বলতে কিছু নেই। একটা বড় অসুখ মানে সর্বনাশ।

রাবেয়ার গল্প ব্যতিক্রম না। এটাই বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আসল চেহারা। সংখ্যায় সাফল্য, বাস্তবে ব্যর্থতা।

এই চার্টটা দেখুন:

২০১১ সালে বাংলাদেশে মাত্র ২০% প্রাপ্তবয়স্কের আর্থিক অ্যাকাউন্ট ছিল। ২০২১ সালে সেটা ৫৩% হয়েছে। ২০২৫ সালে আনুমানিক ৫৭%। বিশ বছরে প্রায় তিন গুণ। চার্ট দেখলে মনে হয় দুর্দান্ত অগ্রগতি।

কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে একটা বড় সত্য লুকিয়ে আছে। অ্যাকাউন্ট থাকা আর আর্থিক সেবা পাওয়া এক জিনিস না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজের হিসাবে, খোলা অ্যাকাউন্টের প্রায় ৪০% নিষ্ক্রিয়। মানে গত ছয় মাসে কোনো লেনদেন হয়নি। এগুলো "জম্বি অ্যাকাউন্ট"। উপবৃত্তি, ভাতা, বা অন্য কোনো সরকারি কারণে খোলা হয়েছে, টাকা এলে তুলে নেওয়া হয়, বাকি সময় মৃত।

আর যাদের অ্যাকাউন্টই নেই? প্রায় ৭ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। তাদের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা কার্যত অস্তিত্বহীন।


পর্ব ২: সংখ্যার খেলা

সংখ্যা দিয়ে সাফল্য দেখানো সহজ। "৫৩% মানুষের অ্যাকাউন্ট আছে" শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু এই ৫৩%-এর ভেতরে ঢুকলে দেখবেন, বৈষম্য চিৎকার করছে।

প্রথম বৈষম্য: লিঙ্গ। এই চার্টটা দেখুন:

দুটো লাইন। নীল: পুরুষ। লাল: নারী। গ্যাপটা দেখুন। ২০১১ সালে পুরুষদের ২৭% এর অ্যাকাউন্ট ছিল, নারীদের মাত্র ১৩%। ব্যবধান ১৪ শতাংশ পয়েন্ট। ২০২১ সালে পুরুষ ৬০%, নারী ৪৮%। ব্যবধান কমেছে, কিন্তু এখনো ১২ শতাংশ পয়েন্ট। ১০ বছরে ব্যবধান মাত্র ২ পয়েন্ট কমলো।

কেন? কারণ বাংলাদেশে একজন নারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে প্রথম প্রশ্ন: "আপনার স্বামীর নাম কী?" এনআইডি আছে, কিন্তু অনেক নারীর ঠিকানা স্বামীর বাড়ি, নিজের নামে কোনো ঠিকানা নেই। ব্যাংকে যাওয়ার সময় নেই, কারণ সংসার সামলাতে হয়। আর গ্রামে ব্যাংকের শাখা এমনিতেই দূরে।

দ্বিতীয় বৈষম্য: শহর বনাম গ্রাম।

শহরে ৬৮% মানুষের অ্যাকাউন্ট আছে, গ্রামে ৪৫%। কিন্তু আসল পার্থক্যটা সক্রিয় ব্যবহারে। শহরে ৫২% অ্যাকাউন্ট সক্রিয়, গ্রামে মাত্র ২৮%। ডিজিটাল পেমেন্ট? শহরে ৪৫%, গ্রামে ১৮%। আনুষ্ঠানিক সঞ্চয়? শহরে ২৮%, গ্রামে ১২%।

বাংলাদেশের ৬০% মানুষ গ্রামে থাকে। মানে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থা প্রায় অর্থহীন। তারা ধান বিক্রি করে নগদ পায়, নগদ দিয়ে বাজার করে, নগদ ধার দেয়, নগদ ধার নেয়। ব্যাংক তাদের জগতে ঢোকেনি।

আর সবচেয়ে বিপজ্জনক সংখ্যাটা হলো: ব্যাংক ঋণ কে পাচ্ছে? এই চার্টটা দেখুন:

দেশের সবচেয়ে ধনী ২০% মানুষ মোট ব্যাংক ঋণের ৫৮% নিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে গরিব ২০%? মাত্র ৩%। মানে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধনীদের আরো ধনী করছে, গরিবদের জন্য দরজা বন্ধ। জামানত নেই, কাগজপত্র নেই, সংযোগ নেই। ব্যাংক ম্যানেজার গরিব কৃষকের ঋণ আবেদন দেখলে ভ্রু কুঁচকায়, বড় ব্যবসায়ীর ফোন পেলে দৌড়ে যায়।

ফলে গরিব মানুষের জন্য একটাই পথ খোলা: অনানুষ্ঠানিক ঋণ। মহাজন, দাদন ব্যবসায়ী, পাড়ার "ভালো মানুষ" যে ৫০-৬০% সুদে ধার দেয়। এই সুদের চক্র থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব।


পর্ব ৩: বিকাশ বিপ্লব

বিকাশ ২০১১ সালে চালু হয়। এর পর নগদ, রকেট, উপায়। মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে একটা বিপ্লব দিয়েছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

২০১৫ সালে মাসিক গড় লেনদেন ছিল ১৮ বিলিয়ন টাকা। ২০২৫ সালে? ৩২০ বিলিয়ন। দশ বছরে প্রায় ১৮ গুণ। বিকাশের ৭.৫ কোটি গ্রাহক, নগদের ৫ কোটির বেশি। প্রতিটা গ্রামে, প্রতিটা বাজারে, প্রতিটা গলির মোড়ে একটা বিকাশ/নগদ এজেন্ট আছে। গার্মেন্টস শ্রমিক বেতন পায় বিকাশে। প্রবাসীরা টাকা পাঠায় বিকাশে। গ্রামের মানুষ বিদ্যুৎ বিল দেয় বিকাশে।

কিন্তু একটু গভীরে তাকান। বিকাশ কি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, নাকি শুধু লেনদেনের সুবিধা?

পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি মানে শুধু টাকা পাঠানো-পাওয়া না। এর মানে হলো সঞ্চয় করার সুযোগ, ঋণ পাওয়ার সুযোগ, বিমা পাওয়ার সুযোগ, বিপদে আর্থিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ। বিকাশে কি সঞ্চয় করা যায়? প্রযুক্তিগতভাবে হ্যাঁ, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ করে না। কারণ সুদ পায় না, আর টাকা রাখলে "চার্জ" কাটে। ঋণ? বিকাশ লোন চালু হয়েছে, কিন্তু পরিমাণ সীমিত, সুদ চড়া। বিমা? কার্যত নেই।

বিকাশ একটা "পাইপ" তৈরি করেছে, যেটা দিয়ে টাকা চলাচল করে। কিন্তু সেই পাইপের ওপারে কোনো আর্থিক পরিষেবার ইকোসিস্টেম নেই। টাকা ঢোকে, টাকা বের হয়। এটুকুই। ভারতের UPI-র সাথে তুলনা করলে পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়:

চীনের WeChat Pay বছরে $৪,৫০০ বিলিয়ন লেনদেন প্রসেস করে। ভারতের UPI $২,০০০ বিলিয়ন। কেনিয়ার M-Pesa $৩২০ বিলিয়ন। বাংলাদেশ? $১০০ বিলিয়ন।

শুধু পরিমাণের পার্থক্য না। গুণগত পার্থক্যও বিশাল। ভারতে UPI-র মাধ্যমে মানুষ মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করে, বিমা কেনে, ঋণ নেয়, কিস্তি দেয়। ভারতের Jan Dhan প্রকল্পে ৫০ কোটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, কিন্তু শুধু অ্যাকাউন্ট না। সেই অ্যাকাউন্টের সাথে সরকারি ভর্তুকি, পেনশন, বিমা, সবকিছু যুক্ত। মানুষের আর্থিক জীবন সেই অ্যাকাউন্টকে কেন্দ্র করে ঘোরে।

বাংলাদেশে বিকাশ দিয়ে টাকা পাঠানো যায়। ব্যস। এটুকুই বিপ্লব।


পর্ব ৪: একটা অসুখে সব শেষ

রাবেয়ার স্বামী একদিন রিকশা থেকে পড়ে গেলেন। পায়ে ফ্র্যাকচার। হাসপাতালে ভর্তি, অপারেশন, ওষুধ, সব মিলিয়ে খরচ ৮০,০০০ টাকা। রাবেয়ার কাছে এই টাকা নেই। সঞ্চয় নেই। বিমা নেই। কী করবেন?

গয়না বিক্রি করলেন ৩০,০০০ টাকায়। মহাজনের কাছ থেকে ৫০,০০০ ধার নিলেন ৬০% সুদে। মেয়েকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনলেন, কারণ বেতন দেওয়ার সামর্থ্য নেই।

একটা দুর্ঘটনা। একটা মাত্র অসুখ। আর পুরো পরিবার দারিদ্র্যের আরো গভীরে তলিয়ে গেল। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। কারণ সুরক্ষার কোনো জাল নেই।

ক্ষুদ্রঋণ কি সাহায্য করে? কিছুটা। এই চার্টটা দেখুন:

গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা, আর অন্যান্য সংস্থা মিলিয়ে প্রায় ৩.৫ কোটি মানুষকে ক্ষুদ্রঋণ দেয়। এটা বিশাল সংখ্যা। কিন্তু যাদের ঋণ দরকার, তাদের সংখ্যা আনুমানিক ৬.৫ কোটি। মানে প্রায় অর্ধেক মানুষ ক্ষুদ্রঋণেরও বাইরে।

আর ক্ষুদ্রঋণ নিজেও সীমিত। পরিমাণ কম, সুদ ২০-২৫%, আর এটা প্রধানত ব্যবসায়িক ঋণ, জরুরি প্রয়োজনের জন্য না। রাবেয়ার স্বামীর অপারেশনের জন্য ক্ষুদ্রঋণ মিলবে না।

মানুষ কোথায় সঞ্চয় করে? এই চার্টটা বলে দেবে:

৩৭% মানুষ কোনো সঞ্চয়ই করে না। যারা করে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ (২২%) বাড়িতে রাখে, মাটির ব্যাংকে, বালিশের নিচে, টিনের বাক্সে। এই টাকায় সুদ তো জমে না, উল্টো চুরি হওয়ার ঝুঁকি, বন্যায় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি। মাত্র ১৪% ব্যাংকে সঞ্চয় করে। মোবাইল ওয়ালেটে ৮%।

আর বিমা? এই চার্টটা বাংলাদেশের সবচেয়ে লজ্জাজনক সংখ্যাগুলোর একটা:

বাংলাদেশের মাত্র ২% মানুষের কোনো না কোনো বিমা আছে। ভারতে ১৫%। থাইল্যান্ডে ৩০%। বৈশ্বিক গড় ৫০%। মানে বাংলাদেশ বিমা সুরক্ষায় পৃথিবীর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর একটা।

১৭ কোটি মানুষের দেশে ২% মানে মাত্র ৩৪ লাখ মানুষের বিমা আছে। বাকি ১৬ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ কোনো সুরক্ষা ছাড়াই বেঁচে আছে। একটা বন্যা, একটা ঘূর্ণিঝড়, একটা অসুখ, একটা দুর্ঘটনা: যেকোনো একটা ঘটনায় সবকিছু শেষ হয়ে যেতে পারে। আর বাংলাদেশে এই ঘটনাগুলো ঘটে প্রায় প্রতিদিন।


পর্ব ৫: আসল অন্তর্ভুক্তি কেমন হয়

ভারত ২০১৪ সালে Jan Dhan Yojana চালু করলো। শুধু অ্যাকাউন্ট খোলা না। তিনটা জিনিস একসাথে দিলো: অ্যাকাউন্ট, বিমা, পেনশন। প্রতিটা Jan Dhan অ্যাকাউন্টের সাথে ২ লাখ টাকার দুর্ঘটনা বিমা আর ৩০,০০০ টাকার জীবন বিমা যুক্ত। বিনামূল্যে। সরকারি ভর্তুকি সরাসরি সেই অ্যাকাউন্টে যায়, মধ্যস্বত্বভোগী নেই। ওভারড্রাফট সুবিধা আছে, জরুরি প্রয়োজনে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত।

তারপর ২০১৬ সালে UPI চালু করলো। যেকোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে যেকোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, তাৎক্ষণিক, বিনামূল্যে। এর উপর গড়ে উঠলো বিশাল ইকোসিস্টেম: ঋণ, বিনিয়োগ, বিমা, সবকিছু ফোনের একটা অ্যাপে।

ফলাফল? ভারতে আর্থিক অ্যাকাউন্ট মালিকানা ২০১১ সালে ৩৫% ছিল, ২০২১ সালে ৭৮%। আর শুধু অ্যাকাউন্ট না, সক্রিয় ব্যবহারও বেড়েছে কয়েক গুণ। UPI-তে মাসে ১২ বিলিয়ন ট্রানজ্যাকশন হচ্ছে।

কেনিয়ার M-Pesa আরেকটা উদাহরণ। একটা দেশ যেখানে ব্যাংক শাখা নেই বললেই চলে, সেখানে মোবাইল মানি দিয়ে ঋণ, সঞ্চয়, বিমা, সবকিছু দেওয়া হচ্ছে। M-Shwari নামে M-Pesa-র একটা প্রোডাক্ট আছে যেটা দিয়ে মানুষ সঞ্চয় করে সুদ পায়, আর জরুরি ঋণ নিতে পারে। ফুলুস (Fuliza) নামে ওভারড্রাফট সুবিধা আছে।

বাংলাদেশের কাছে সব উপকরণ আছে। বিকাশ/নগদের নেটওয়ার্ক আছে, ১৩ লাখ এজেন্ট পয়েন্ট আছে, মোবাইল ফোনের ব্যাপক বিস্তার আছে। যা নেই সেটা হলো নীতি, নকশা, আর ইচ্ছা।

বাংলাদেশকে তিনটা কাজ করতে হবে।

প্রথমত, প্রতিটা মোবাইল ওয়ালেটকে "মিনি ব্যাংক" বানাতে হবে। শুধু টাকা পাঠানো-পাওয়া না। সঞ্চয়ে সুদ দিতে হবে। ক্ষুদ্র ঋণ দিতে হবে (ক্রেডিট স্কোরিং হবে লেনদেনের ইতিহাস দিয়ে, কাগজপত্র দিয়ে না)। মাইক্রো-ইনস্যুরেন্স দিতে হবে, মাসে ৫০ টাকায় স্বাস্থ্য বিমা, ২০ টাকায় ফসল বিমা।

দ্বিতীয়ত, সরকারি সব পেমেন্ট ডিজিটাল করতে হবে। উপবৃত্তি, ভাতা, পেনশন, ভিজিডি, ভিজিএফ, সবকিছু সরাসরি মোবাইল ওয়ালেটে। মধ্যস্বত্বভোগী শূন্য। এতে অ্যাকাউন্ট সক্রিয় থাকবে, মানুষ ডিজিটাল ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হবে।

তৃতীয়ত, জাতীয় বিমা কর্মসূচি চালু করতে হবে। ভারতের মতো প্রতিটা অ্যাকাউন্টের সাথে বিনামূল্যে দুর্ঘটনা বিমা। সরকারের খরচ হবে বছরে ২,০০০-৩,০০০ কোটি টাকা। শুনতে অনেক মনে হচ্ছে? রাবেয়ার মতো ৫০ লাখ মানুষ প্রতি বছর স্বাস্থ্য ব্যয়ে দরিদ্র হয়ে পড়ার অর্থনৈতিক ক্ষতি এর চেয়ে অনেক বেশি।


রাবেয়া বেগমের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। কুমিল্লার দেবিদ্বারে, সোনালী ব্যাংকে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে যিনি অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন।

সেই অ্যাকাউন্টে এখনো শূন্য টাকা। স্বামী এখনো রিকশা চালায়, পায়ে এখনো ব্যথা। মহাজনের ৫০,০০০ টাকা এখনো শোধ হয়নি, সুদে ৮০,০০০ হয়ে গেছে। বড় মেয়ে স্কুলে ফেরেনি।

সরকারের হিসাবে রাবেয়া "আর্থিকভাবে অন্তর্ভুক্ত"। তার একটা অ্যাকাউন্ট আছে। একটা সংখ্যা আছে। একটা পরিসংখ্যানে তিনি গোনা হচ্ছেন।

কিন্তু আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কি শুধু গোনা হওয়া? নাকি এর মানে হওয়া উচিত যে একটা অসুখে পুরো পরিবার ধ্বংস হবে না? যে মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হবে না? যে মহাজনের ৬০% সুদের ফাঁদে পড়তে হবে না?

অ্যাকাউন্ট আছে, টাকা নেই। এটা বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সারাংশ। সংখ্যায় সাফল্য, জীবনে ব্যর্থতা। যতদিন না আমরা সংখ্যার বাইরে তাকাই, রাবেয়ার মতো কোটি মানুষের জন্য কিছুই বদলাবে না।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50