বস্তিতে কত মানুষ বাস করে?
পর্ব ১: রহিমার ঘর
রহিমা বেগমের ঘর ১০০ বর্গফুট। টিনের চাল, বাঁশের বেড়া, মাটির মেঝে। এই ঘরে থাকে পাঁচজন: রহিমা, তার স্বামী রিকশাচালক জব্বার, দুই মেয়ে আর এক ছেলে। রাতে সবাই পাশাপাশি শুয়ে পড়ে। গরমকালে ঘরের ভেতর তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়ায়। বৃষ্টি হলে চাল দিয়ে পানি পড়ে। শীতকালে দেয়ালের ফাঁক দিয়ে হাওয়া ঢোকে।
রহিমা ভোর ৫টায় ওঠে। পাশের বাসার টিউবওয়েলে লাইন দেয়। ৩০-৪০ জন মানুষের একটা টিউবওয়েল। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ৪৫ মিনিট চলে যায়। দুই কলসি পানি নিয়ে ঘরে ফেরে। এই পানি দিয়ে রান্না, গোসল, বাসন ধোয়া, সবকিছু চালাতে হবে। পানি ফুটিয়ে খাওয়ার সময় বা জ্বালানি নেই। তাই কাঁচা পানিই খায়। ছেলেমেয়েদের প্রায়ই ডায়রিয়া হয়।
টয়লেট? ২০টা পরিবারের জন্য একটা। সেটাও ভাঙা। ড্রেন উপচে পড়ে বর্ষাকালে। পায়খানার পানি আর রান্নার পানি একই নালা দিয়ে যায়। গন্ধ এতটাই তীব্র যে প্রথমবার এলে দম বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু রহিমা অভ্যস্ত। পনেরো বছর ধরে এখানে থাকছে।
রহিমা একা না। ঢাকায় তার মতো প্রায় ৬০ লাখ মানুষ বস্তিতে থাকে। Centre for Urban Studies (CUS) এর জরিপ অনুযায়ী ঢাকা মহানগরীতে ৩,৪০০-এর বেশি বস্তি আছে। প্রতিটা বস্তিতে কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার পরিবার। তাদের না আছে জমির মালিকানা, না আছে স্থায়ী ঠিকানা, না আছে ভোটার আইডিতে ঠিকানা লেখার জায়গা।
এই সংখ্যাটা কীভাবে এত বড় হলো? এই চার্টটা দেখুন:
১৯৯৬ সালে ঢাকায় বস্তিবাসী ছিল প্রায় ১৫ লাখ। ২০০৫ সালে ৩৫ লাখ। ২০১৪ সালে ৪৫ লাখ। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৬০ লাখ। তিন দশকে চার গুণ। ঢাকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০%। প্রতি তিনজনে একজন বস্তিবাসী।
আর এই বস্তিগুলো কোথায়? কতগুলো? এই চার্টটা দেখুন:
কড়াইল, কল্যাণপুর, মিরপুর রেললাইন, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ, বাসাবো রেললাইন। ঢাকার প্রায় প্রতিটা থানায় বস্তি আছে। রেললাইনের পাশে, নদীর ধারে, সরকারি জমিতে, খালের পাড়ে। যেখানে কেউ থাকতে চায় না, সেখানে বস্তিবাসীরা থাকে। কারণ তাদের আর কোনো জায়গা নেই।
কিন্তু এই মানুষগুলো এখানে এলো কেন? তারা কি ঢাকায় জন্মেছে? না। তাদের প্রায় সবাই এসেছে গ্রাম থেকে।
পর্ব ২: কেন আসে, কোথা থেকে আসে
বস্তিবাসীদের ৮৫%-এর বেশি গ্রাম থেকে এসেছে। কেউ নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে, কেউ মঙ্গায় না খেয়ে, কেউ ভূমিহীন হয়ে। তারা গ্রামে আর টিকতে পারেনি। ঢাকায় এসেছে একটাই আশায়: কাজ পাবে, খেতে পারবে।
কোন কোন জেলা থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ আসে? এই চার্টটা দেখুন:
বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, শরীয়তপুর। এই জেলাগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঢাকার বস্তিতে এসেছে। একটা প্যাটার্ন দেখুন: এগুলো হয় নদীভাঙন-প্রবণ জেলা, নয় উত্তরবঙ্গের মঙ্গা-আক্রান্ত জেলা, নয় দক্ষিণের ঘূর্ণিঝড়-প্রবণ উপকূল।
জলবায়ু পরিবর্তন এই অভিবাসনকে আরো তীব্র করছে। IDMC (Internal Displacement Monitoring Centre) এর হিসাবে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৪০-৭০ লাখ মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাময়িকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়। তাদের একটা অংশ আর ফেরে না। তারা ঢাকায় চলে আসে। বস্তিতে ঠাঁই নেয়।
ঢাকায় এসে কী করে? রিকশা চালায়, গার্মেন্টসে কাজ করে, নির্মাণ শ্রমিক হয়, গৃহকর্মী হয়, ভ্যান চালায়, কুলি হয়, ফেরিওয়ালা হয়। এই শহরের পুরো অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি চলে বস্তিবাসীদের শ্রমে। কিন্তু তাদের আয় কত?
গড় মাসিক পারিবারিক আয় ১২,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা। দিনে ৪০০-৫০০ টাকা। এর মধ্যে ঘরভাড়া ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা। মানে আয়ের ২৫-৪০% শুধু ভাড়ায় চলে যায়। বাকি টাকায় খাবার, ওষুধ, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, সব চালাতে হয়। মাংস বা মাছ প্রতিদিন খাওয়ার সামর্থ্য নেই। ডিম-ডাল-ভাত, এটাই মূল খাবার।
আর এই ভাড়ার টাকাটা কোথায় যায়? বস্তির মালিকের কাছে। হ্যাঁ, বস্তির মালিক আছে। ঢাকার বেশিরভাগ বস্তি সরকারি জমিতে, কিন্তু সেই জমিতে ঘর তুলে ভাড়া আদায় করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তারা রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত, পুলিশের সাথে বোঝাপড়া আছে, প্রশাসনে তাদের লোক আছে। বস্তিবাসী প্রতি মাসে ভাড়া দেয়, কিন্তু কোনো রসিদ পায় না, কোনো চুক্তি নেই, কোনো অধিকার নেই। যেকোনো দিন উচ্ছেদ হতে পারে।
পর্ব ৩: উচ্ছেদ, আগুন আর পানির লড়াই
"ক্লিয়ার করো।" এই দুই শব্দে হাজার হাজার পরিবারের জীবন ওলটপালট হয়ে যায়।
ঢাকায় বস্তি উচ্ছেদ একটা নিয়মিত ঘটনা। কখনো "উন্নয়ন প্রকল্পের" জন্য, কখনো "অবৈধ দখল মুক্ত করতে", কখনো "নদী রক্ষায়"। কারণ যাই হোক, ফলাফল একটাই: বুলডোজার এসে সব গুঁড়িয়ে দেয়। টিনের চাল, বাঁশের খুঁটি, কাপড়চোপড়, রান্নার হাঁড়িপাতিল, সব মাটিতে মিশে যায়। মানুষগুলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। কোথায় যাবে জানে না।
এই চার্টটা দেখুন:
২০০০ সাল থেকে ঢাকায় বড় বড় উচ্ছেদ অভিযানে কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ২০১২ সালে কড়াইল বস্তিতে আগুন ও উচ্ছেদে প্রায় ৫০,০০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৬ সালে মিরপুরের একটি বস্তিতে উচ্ছেদে ৩০,০০০। ২০২০ সালের পর কোভিডকালেও উচ্ছেদ থামেনি। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয়: উচ্ছেদের পর পুনর্বাসনের হার ৫%-এরও কম। মানে ৯৫% মানুষ উচ্ছেদের পর আরেকটা বস্তিতে গিয়ে ওঠে। সমস্যার সমাধান হয় না, সমস্যা শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরে যায়।
আর উচ্ছেদের চেয়েও ভয়ংকর হলো আগুন। ঢাকার বস্তিতে আগুন লাগা প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। টিনের ঘর, বাঁশের কাঠামো, প্লাস্টিকের চাদর, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ: এগুলো মিলে বস্তিকে আগুনের ফাঁদে পরিণত করে। সরু গলি, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার রাস্তা নেই। আগুন লাগলে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ঢাকায় বস্তিতে বড় আগুনের ঘটনা শতাধিক। প্রতি বছর গড়ে ৮-১৫টা বড় আগুন। প্রতিটাতে শত শত ঘর পুড়ে যায়, হাজার হাজার মানুষ সর্বস্বান্ত হয়। অনেকে সন্দেহ করে যে কিছু আগুন ইচ্ছাকৃত: বস্তি পুড়িয়ে জমি দখল করার কৌশল। প্রমাণ পাওয়া কঠিন, কিন্তু প্যাটার্নটা উদ্বেগজনক। আগুনের পর প্রায়ই সেই জমিতে বহুতল ভবন উঠে যায়। বস্তিবাসীরা আর ফিরতে পারে না।
আর এই সবকিছুর মাঝে বস্তিবাসীদের প্রতিদিনের সবচেয়ে বড় লড়াই হলো পানি আর স্যানিটেশন।
বস্তিবাসীদের মাত্র ১৮% নিরাপদ পানির সংযোগ পায় (DWASA পাইপলাইন)। বাকিরা টিউবওয়েল, পুকুর, বা কেনা পানির উপর নির্ভরশীল। অনেক বস্তিতে পানি কিনতে হয় প্রতি কলসি ৫-১০ টাকা দরে। গরিব মানুষ পানির জন্য আয়ের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ খরচ করে, যেখানে ধনীরা প্রায় বিনামূল্যে DWASA-র পানি পায়। পানির বৈষম্য ঢাকার সবচেয়ে নিষ্ঠুর বৈষম্যগুলোর একটি।
আর স্যানিটেশনের অবস্থা আরো ভয়াবহ:
মাত্র ১০% বস্তিবাসী স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহার করতে পারে। বাকিরা ভাগাভাগি করা, ভাঙা, অপরিষ্কার টয়লেট ব্যবহার করে, অথবা খোলা জায়গায় যায়। একটা টয়লেটে ১০-১৫ পরিবার, কখনো ২০ পরিবার। মহিলারা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়। রাতে টয়লেটে যেতে ভয় পায়, নিরাপত্তার অভাবে। অনেকে দিনভর পানি কম খায় যাতে টয়লেটে কম যেতে হয়। এতে কিডনি আর মূত্রনালীর সমস্যা হয়।
UNICEF আর WHO-র যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার বস্তিতে শিশুমৃত্যুর হার শহরের অন্যান্য এলাকার তুলনায় তিন গুণ বেশি। প্রধান কারণ: দূষিত পানি ও অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন থেকে সৃষ্ট ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, আর অপুষ্টি।
পর্ব ৪: ১০০ বর্গফুটে জীবন
একটু থামুন। ১০০ বর্গফুট কল্পনা করুন। একটা স্ট্যান্ডার্ড পার্কিং স্পেসের চেয়ে ছোট। আপনার বাথরুমের সমান হতে পারে, বা তার চেয়ে ছোট। এই জায়গায় ৪-৫ জন মানুষ ঘুমায়, রান্না করে, পড়াশোনা করে, অসুস্থ হলে শুয়ে থাকে।
এই ঘনত্বটা পৃথিবীর অন্য বস্তিগুলোর সাথে তুলনা করলে কেমন?
ঢাকার বস্তিতে প্রতি ঘরে গড়ে ৪.৫ জন থাকে, ঘরের গড় আয়তন ১০০ বর্গফুট। মানে মাথাপিছু জায়গা ২২ বর্গফুট, প্রায় ২ বর্গমিটার। মুম্বাইয়ের ধারাভিতে মাথাপিছু জায়গা ২.৫ বর্গমিটার। নাইরোবির কিবেরায় ৩ বর্গমিটার। ঢাকার বস্তি পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলোর একটি।
এই পরিস্থিতি কি শুধু ঢাকার সমস্যা? না। পৃথিবীর অনেক শহরেই বস্তি আছে। কিন্তু সবাই কি একই রকম? এই চার্টটা দেখুন:
মুম্বাইতে প্রায় ৯০ লাখ বস্তিবাসী, কিন্তু সেখানে বস্তি পুনর্বাসন কর্তৃপক্ষ (SRA) আছে, বস্তিবাসীদের ভোটার আইডি আছে, রেশন কার্ড আছে, অনেক বস্তিতে পাকা রাস্তা ও পানির লাইন আছে। নাইরোবির কিবেরায় NGO-দের মাধ্যমে স্যানিটেশন প্রকল্প চলছে। মেদেইনে (কলম্বিয়া) বস্তি এলাকায় ক্যাবল কার, লাইব্রেরি, পার্ক তৈরি হয়েছে। ঢাকায়? বস্তিবাসীদের জন্য সরকারি কোনো পরিকল্পনা কার্যত নেই। আছে শুধু উচ্ছেদ।
পর্ব ৫: অদৃশ্য শ্রমিক, অদৃশ্য অর্থনীতি
ঢাকার বস্তিবাসীরা অদৃশ্য, কিন্তু তাদের শ্রম ছাড়া ঢাকা একদিনও চলবে না।
আপনার বাসায় যে গৃহকর্মী কাজ করে, সে বস্তিতে থাকে। যে রিকশাচালক আপনাকে অফিসে নিয়ে যায়, সে বস্তিতে থাকে। আপনার অফিস বিল্ডিংয়ের নির্মাণ শ্রমিক, চা-ওয়ালা, সিকিউরিটি গার্ড, ক্লিনার: এদের বেশিরভাগ বস্তিতে থাকে। গার্মেন্টস কারখানার ৪০ লাখ শ্রমিকের একটা বড় অংশ বস্তিবাসী। ঢাকার রেস্তোরাঁর রাঁধুনি, হোটেলের বয়, মার্কেটের কুলি, সবাই।
ঢাকার অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি (GDP-র প্রায় ৪০%) মূলত বস্তিবাসীদের শ্রমে চলে। তারা শহরকে চালায়, কিন্তু শহর তাদের চেনে না। তাদের কোনো সামাজিক সুরক্ষা নেই। অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতালে যায়, কিন্তু সেখানে ভিড় এত বেশি যে ডাক্তারের দেখা পেতে সারাদিন লাগে। ওষুধ কিনতে হয় নিজের পকেট থেকে। একটা বড় অসুখ হলে পুরো পরিবার ঋণের জালে আটকে যায়।
এই মানুষগুলোর জন্য কী করা যায়? পৃথিবীতে উদাহরণ আছে।
ব্রাজিলের ফাভেলা-বাইরো প্রোগ্রাম: রিও ডি জেনেইরোতে ১৯৯৫ সালে শুরু হয়। বস্তি উচ্ছেদ না করে বস্তিকে উন্নত করা হলো। রাস্তা পাকা করা, পানি-বিদ্যুৎ সংযোগ, স্কুল-ক্লিনিক তৈরি, জমির অধিকার দেওয়া। ১০ বছরে ৬ লাখ মানুষের জীবনমান উন্নত হলো।
ভারতের রাজীব আবাস যোজনা: বস্তিবাসীদের ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রকল্প। সমস্যা আছে (অনেকে ফ্ল্যাট পেয়ে বিক্রি করে দেয়, লোকেশন দূরে হওয়ায় কাজ হারায়), কিন্তু অন্তত একটা নীতিগত স্বীকৃতি আছে যে বস্তিবাসীদের আবাসনের অধিকার আছে।
থাইল্যান্ডের CODI মডেল: কমিউনিটি-ভিত্তিক আবাসন। বস্তিবাসীদের সংগঠিত করে তাদের নিজেদের হাতে পরিকল্পনা ও নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সরকার জমি ও ঋণ দেয়, বাসিন্দারা নিজেরা ঘর তৈরি করে।
বাংলাদেশে এর কোনোটাই নেই। জাতীয় আবাসন নীতি ২০১৬ তে "বস্তি উন্নয়নের" কথা আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন প্রায় শূন্য। বস্তিবাসীদের জন্য বাজেটে আলাদা কোনো বরাদ্দ নেই। আছে শুধু মাঝেমধ্যে NGO-দের প্রকল্প, যেগুলো ছোট আকারে কিছু পরিবারকে সাহায্য করে, কিন্তু কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না।
পর্ব ৬: রহিমার প্রশ্ন
আসুন ফিরে যাই রহিমার কাছে।
রহিমা ভোলা থেকে এসেছিল ২০১০ সালে। নদী তাদের বাড়ি খেয়ে নিয়েছিল। বাবার তিন বিঘা জমি ছিল, সব নদীতে গেছে। প্রথমে বাঁধের উপর থাকতো, তারপর আত্মীয়ের বাড়িতে, তারপর ঢাকা।
পনেরো বছর ধরে ঢাকায় আছে। ভাড়া দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোনো স্থায়িত্ব নেই। গত বছর বস্তিতে আগুন লেগে পাশের সারির ঘরগুলো পুড়ে গেছে। তার ঘর বেঁচেছে, কিন্তু ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারে না। উচ্ছেদের গুজব শোনে মাঝেমধ্যে। "শুনছি সরকার এই জায়গায় রাস্তা করবে।" তাহলে কোথায় যাবে?
তার বড় মেয়ে ক্লাস সেভেনে পড়ে। পড়াশোনায় ভালো। কিন্তু বস্তিতে পড়ার জায়গা নেই। সন্ধ্যায় রাস্তার আলোয় বসে পড়ে। রহিমা চায় মেয়েটা যেন SSC পাস করে, একটা চাকরি পায়, বস্তি থেকে বের হয়। কিন্তু বস্তির ঠিকানা দিয়ে কোথায় চাকরির আবেদন করবে? কে তাকে নেবে?
রহিমা জানে না যে ঢাকায় ৬০ লাখ মানুষ তার মতো। সে জানে না যে CUS-র জরিপে তার ঘরটা একটা সংখ্যা মাত্র। সে শুধু জানে যে পনেরো বছর ধরে ঢাকায় আছে, এখনো "অবৈধ বাসিন্দা"। ট্যাক্স দেয় না কারণ আয় এত কম যে ট্যাক্সের আওতায় পড়ে না। কিন্তু ভাড়া দেয়, বাজার করে, বিদ্যুৎ বিল দেয় (অবৈধ সংযোগে হলেও), সন্তানদের স্কুলে পাঠায়। সে এই শহরের অংশ, কিন্তু শহর তাকে তার অংশ মনে করে না।
পৃথিবীর অনেক শহর তাদের বস্তিবাসীদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জমির অধিকার দিয়েছে, আবাসনের ব্যবস্থা করেছে, মৌলিক সেবা পৌঁছে দিয়েছে। এটা দয়া না, এটা বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ বস্তিবাসী সুস্থ থাকলে, তাদের সন্তানরা শিক্ষিত হলে, তারা আরো বেশি উৎপাদনশীল হয়। পুরো শহরের অর্থনীতি লাভবান হয়।
ঢাকা কি এটা করবে? নাকি আমরা এভাবেই চালিয়ে যাবো: ৬০ লাখ মানুষকে না দেখার ভান করে, তাদের শ্রম ব্যবহার করে, আর মাঝেমধ্যে বুলডোজার পাঠিয়ে?
রহিমার মেয়ে যখন বড় হবে, ২০৩৫ সালে ঢাকার বস্তিবাসী হবে আনুমানিক ৮০-৯০ লাখ। তখন কি আমরা এখনকার মতোই বলবো, "বস্তি সমস্যা"? নাকি স্বীকার করবো যে এটা আসলে "নীতি ব্যর্থতা"?
১০০ বর্গফুটের একটা ঘরে পাঁচজন মানুষ থাকে। সেই ঘরে আশাও থাকে। সেই আশার কোনো দাম কি আমাদের কাছে আছে?