যে মাটি সোনা ফলাত, সে মাটি কোথায়?
পর্ব ১: আকাশ থেকে দেখুন
গুগল আর্থে বাংলাদেশ খুলুন। ২০০৫ সালের ছবি দেখুন। সবুজ। চোখ জুড়ানো সবুজ। ধানক্ষেত, পাটক্ষেত, সবজিবাগান, পুকুর, খাল, নদী। একটা সবুজ দেশ।
এবার ২০২৫ সালের ছবিতে যান। ঢাকার চারপাশ দেখুন। যেখানে ধানক্ষেত ছিল, সেখানে এখন অ্যাপার্টমেন্ট। যেখানে পুকুর ছিল, সেখানে শপিং মল। যেখানে পাটক্ষেত ছিল, সেখানে ইটভাটার চিমনি থেকে কালো ধোঁয়া উঠছে।
প্রতিদিন বাংলাদেশ হারাচ্ছে প্রায় ২২০ একর কৃষিজমি। প্রতিদিন। এক বছরে প্রায় ৮০,০০০ একর। এটা রাজশাহী শহরের আয়তনের চেয়ে বেশি। প্রতি বছর একটা গোটা শহরের সমান কৃষিজমি মুছে যাচ্ছে মানচিত্র থেকে।
এই জমি কোথায় যাচ্ছে? বাড়ি হচ্ছে, রাস্তা হচ্ছে, কারখানা হচ্ছে, ইটভাটা গিলে খাচ্ছে। আর যেটুকু কৃষিজমি টিকে আছে, সেটার মাটি? সেটার জীবনীশক্তি? সেটাও শেষ হয়ে যাচ্ছে।
এই গল্পটা বাংলাদেশের সবচেয়ে নীরব সংকটের গল্প। শেয়ারবাজার পড়লে সংবাদপত্রে হেডলাইন হয়। ডলারের দাম বাড়লে টকশো হয়। কিন্তু প্রতিদিন ২২০ একর কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে, এটা নিয়ে কেউ কথা বলে না। কারণ মাটি চিৎকার করে না।
এই চার্টটা দেখুন:
১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের কৃষিজমির পরিমাণ ক্রমাগত কমছে। ৯০ লাখ হেক্টর থেকে নেমে এসেছে ৭৮ লাখ হেক্টরে। চল্লিশ বছরে ১২ লাখ হেক্টর হারিয়েছি। এই ১২ লাখ হেক্টর জমিতে কত ধান ফলতো, কত মানুষের খাবার হতো, সেই হিসাব কেউ করে না।
আর এই হারানোর গতি কমছে না, বাড়ছে।
২০০০ সালে প্রতিদিন ১৫০ একর হারাতাম। ২০১৫ সালে ২০০ একর। ২০২৫ সালে ২২০ একর। ত্বরান্বিত গতিতে কমছে কৃষিজমি। জনসংখ্যা বাড়ছে, জমি কমছে। এই দুটো রেখা যেখানে মিলবে, সেখানে একটা ভয়ংকর বাস্তবতা অপেক্ষা করছে।
পর্ব ২: কংক্রিট গিলে খাচ্ছে সবুজ
কৃষিজমি কোথায় যাচ্ছে? উত্তরটা জটিল না। তিনটা প্রধান কারণ: নগরায়ণ, শিল্পায়ন, আর ইটভাটা।
ঢাকা ১৯৯০ সালে ছিল ৩০০ বর্গকিলোমিটারের শহর। আজ ৫৫০ বর্গকিলোমিটারের বেশি। চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, সবখানে একই ছবি। শহর ফুলে উঠছে, আর তার চারপাশের ধানক্ষেত কংক্রিটে ডুবে যাচ্ছে।
গত বিশ বছরে বাংলাদেশের শহর এলাকা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। শিল্প এলাকা বেড়েছে তিনগুণ। আর কৃষিজমি? প্রতি বছর কমেছে। এটা একমুখী রাস্তা। একবার ধানক্ষেতের উপর অ্যাপার্টমেন্ট উঠে গেলে সেই জমি আর কোনোদিন ফিরে আসে না।
কিন্তু সবচেয়ে নীরব ঘাতক হলো ইটভাটা। বাংলাদেশে প্রায় ৮,০০০ ইটভাটা আছে। এদের প্রত্যেকটার জ্বালানি কী? মাটি। উপরের স্তরের উর্বর মাটি, যেটাকে বলে "টপসয়েল"। ইটভাটা এই টপসয়েল তুলে নেয়, পুড়িয়ে ইট বানায়। একটা ইটভাটা বছরে প্রায় ৩-৪ ফুট গভীর করে একটা বড় এলাকার টপসয়েল খেয়ে ফেলে।
৮,০০০ ইটভাটা প্রতি বছর আনুমানিক ১৪ কোটি ঘনফুট টপসয়েল গিলে খাচ্ছে। এই মাটি তৈরি হতে প্রকৃতির লেগেছে শত শত বছর। ইটভাটা সেটা কয়েক সপ্তাহে শেষ করে দিচ্ছে। আর উপরি পাওনা হিসেবে প্রতি বছর ১.৮ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ছে বাতাসে।
একটা প্রশ্ন উঠে আসে: বাড়ি তো বানাতে হবে, রাস্তা তো হবে, শিল্পায়ন তো দরকার। তাহলে সমাধান কী?
সমাধান আছে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, চীন, এই দেশগুলো কৃষিজমি সুরক্ষা আইন করেছে। প্রাইম ফার্মল্যান্ড রূপান্তর নিষিদ্ধ। শহর পরিকল্পনায় কৃষিজমি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। উল্লম্বভাবে (ওপরে ওপরে) নির্মাণ করো, আশেপাশে ছড়িয়ে না। ইটের বদলে কংক্রিট ব্লক, ফ্লাই অ্যাশ ব্রিক, বিকল্প উপকরণ ব্যবহার করো।
বাংলাদেশে কৃষিজমি সুরক্ষা আইন আছে। কিন্তু প্রয়োগ প্রায় শূন্য। প্রভাবশালীরা যখন চান, কৃষিজমি "শিল্প জমি"-তে রূপান্তর হয়ে যায়। রাজউক যখন পরিকল্পনা করে, কৃষিজমি আর থাকে না।
পর্ব ৩: মাটি ক্লান্ত
ধরুন কৃষিজমি হারানো বন্ধ হলো। যেটুকু আছে, সেটুকু রইলো। তাহলে কি সমস্যা মিটে গেলো?
না। কারণ যে মাটি টিকে আছে, সেই মাটিও মরে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের কৃষক প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩৫০ কেজি রাসায়নিক সার ব্যবহার করে। বিশ্ব গড়? ১৩৫ কেজি। ভারত? ১৮০ কেজি। মানে বাংলাদেশের কৃষক বিশ্ব গড়ের প্রায় তিনগুণ সার ঢালছে মাটিতে।
এতো সার কেন দিতে হয়? কারণ মাটি ক্লান্ত। দশকের পর দশক একই জমিতে বছরে তিনবার ফসল ফলানো হচ্ছে। জৈব পদার্থ যোগ করা হচ্ছে না। গোবর সার, কম্পোস্ট, সবুজ সার, এগুলোর ব্যবহার কমে গেছে। ফলে মাটির নিজস্ব উর্বরতা কমে গেছে। সেই ঘাটতি পূরণ করতে রাসায়নিক সার দিতে হচ্ছে। আর বেশি সার দিলে মাটির অণুজীব মরে যায়, জৈব পদার্থ আরো কমে, উর্বরতা আরো কমে, আরো বেশি সার লাগে। একটা দুষ্টচক্র।
মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ দেখুন। ১৯৯০ সালে গড়ে ছিল ২.৫%। এখন ১.৫% এর নিচে। সুস্থ মাটিতে কমপক্ষে ৩% জৈব পদার্থ থাকা উচিত। বাংলাদেশের বেশিরভাগ কৃষিজমিতে এটা বিপজ্জনক মাত্রায় কম। রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, সবখানে একই চিত্র। মাটি শুকিয়ে যাচ্ছে, শক্ত হয়ে যাচ্ছে, প্রাণ হারাচ্ছে।
এর ফলাফল? ফলন আটকে গেছে।
বাংলাদেশের ধানের ফলন ১৯৯০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত দ্রুত বেড়েছে। সবুজ বিপ্লবের ফসল। উন্নত বীজ, সেচ, সার, এগুলোর কারণে ফলন দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু ২০১৫ এর পর? বৃদ্ধি প্রায় থেমে গেছে। প্রতি হেক্টরে ৪.৫-৪.৮ টনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আরো সার দিচ্ছি, আরো কীটনাশক দিচ্ছি, কিন্তু ফলন বাড়ছে না। মাটি আর সাড়া দিচ্ছে না।
এটাকে বিজ্ঞানীরা বলেন "ইল্ড প্লেটো"। সবুজ বিপ্লবের সুফল শেষ। এরপর ফলন বাড়াতে হলে মাটির স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু সেদিকে কারো নজর নেই।
পর্ব ৪: ভর্তুকির ফাঁদ
সার কেন এত বেশি ব্যবহার হয়? শুধু মাটির ক্লান্তি না। আরেকটা কারণ আছে: সার সস্তা। কৃত্রিমভাবে সস্তা।
বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর সারে ভর্তুকি দেয় ২৫,০০০ কোটি টাকারও বেশি। প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার। ইউরিয়া সারের আন্তর্জাতিক দাম প্রতি কেজি ৩৫-৪০ টাকা হলে কৃষক পায় ১৬ টাকায়। অর্ধেকের কম দামে। ডিএপি, টিএসপি, পটাশ, সব সারেই ভর্তুকি আছে।
ভর্তুকি মানে কৃষকের জন্য সার সস্তা। সস্তা মানে বেশি ব্যবহার। বেশি ব্যবহার মানে মাটি আরো ক্ষতিগ্রস্ত। ক্ষতিগ্রস্ত মাটি মানে আরো বেশি সার দরকার। আরো বেশি সার মানে আরো বেশি ভর্তুকি। একটা চক্র, যেটা থেকে বের হওয়ার পথ কেউ খুঁজছে না।
আর এই ভর্তুকির সুবিধা কে পাচ্ছে? সত্যিকারের প্রান্তিক কৃষক, নাকি বড় জোতদার? গবেষণা বলছে, ভর্তুকিযুক্ত সারের ৩০-৪০% যায় বড় কৃষকদের কাছে, যাদের আসলে ভর্তুকি দরকার নেই। কিছু অংশ পাচার হয় সীমান্তের ওপারে। আর বাকিটুকু? হ্যাঁ, প্রান্তিক কৃষক পায়, কিন্তু সেই সার সে মাটিতে ঢেলে দিচ্ছে পরিমাণমতো না, যতটুকু পারে ততটুকু। কারণ কেউ তাকে শেখায়নি কতটুকু দরকার, কখন দরকার, কীভাবে দিতে হয়।
ভারত ২০২২ সালে ন্যানো ইউরিয়া চালু করেছে। একটা ছোট বোতল, ৫০০ মিলিলিটার, যেটা দিয়ে এক একর জমিতে কাজ হয়। প্রচলিত ইউরিয়ার একটা পুরো বস্তার (৪৫ কেজি) বদলে। ব্যবহার কম, অপচয় কম, মাটির ক্ষতি কম। বাংলাদেশ এই প্রযুক্তি গ্রহণ করেনি।
তাহলে ভর্তুকি বন্ধ করলে কী হবে? কৃষক বিপদে পড়বে। সারের দাম দ্বিগুণ হলে ছোট কৃষকের পক্ষে চাষ করা অসম্ভব হবে। সুতরাং ভর্তুকি হুট করে বন্ধ করা যাবে না। কিন্তু ভর্তুকির ধরন বদলানো যায়। সারের উপর ভর্তুকি না দিয়ে সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে টাকা দিন (Direct Benefit Transfer)। কৃষক নিজে ঠিক করুক সে সার কিনবে, নাকি জৈব সার বানাবে, নাকি অন্য কিছু করবে। ভারত এটা শুরু করেছে। ফলাফল? সারের অপচয় ২০-৩০% কমেছে।
পর্ব ৫: খাদ্যে পরনির্ভরতা
"বাংলাদেশ চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ।" এই কথাটা আমরা গর্বের সাথে বলি। সত্যি, ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশাল অগ্রগতি করেছে। ১৯৭১ সালে ১ কোটি টন চাল উৎপাদন হতো, এখন ৩.৮ কোটি টন। তিনগুণেরও বেশি। এটা সত্যিকারের সাফল্য।
কিন্তু চাল দিয়ে তো পুষ্টি পূরণ হয় না। মানুষ শুধু ভাত খায় না। গম লাগে, ডাল লাগে, ভোজ্যতেল লাগে, চিনি লাগে, ফল লাগে। আর এগুলোর কতটুকু বাংলাদেশ নিজে উৎপাদন করে?
গম: প্রায় ১০০% আমদানি। ভোজ্যতেল: ৯০%। চিনি: ৮০%। ডাল: ৬০%। দুধ: ৫০% এর বেশি। ফল: ৩০% এর বেশি। মানে চাল বাদ দিলে বাংলাদেশের খাদ্যের বড় অংশ আসে বাইরে থেকে।
এখন একটু ভাবুন। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে কী হবে? ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় গমের দাম ৪০% বেড়েছিল। ভোজ্যতেলের দাম দ্বিগুণ হয়েছিল। বাংলাদেশকে সেই বাড়তি দামে কিনতে হয়েছিল, কারণ বিকল্প নেই।
যদি আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম ২০% বাড়ে, বাংলাদেশের আমদানি বিল বাড়বে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। ৪০% বাড়লে? প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। এই অতিরিক্ত ডলার কোথা থেকে আসবে? ফরেন রিজার্ভ থেকে। যেই রিজার্ভ এমনিতেই চাপে আছে।
আর জলবায়ু পরিবর্তন এই ঝুঁকি আরো বাড়াচ্ছে। লবণাক্ততা বাড়ছে দক্ষিণাঞ্চলে। বন্যা আরো ঘন ঘন হচ্ছে। খরা বাড়ছে উত্তরাঞ্চলে। এগুলো ফসল উৎপাদন কমাবে। মানে আমদানি নির্ভরতা আরো বাড়বে।
আমরা একটা ভয়ংকর সমীকরণের মধ্যে আছি: কৃষিজমি কমছে, মাটির উর্বরতা কমছে, ফলন আটকে আছে, জনসংখ্যা বাড়ছে, খাদ্যচাহিদা বাড়ছে, আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে, আর আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল।
আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।
আকাশ থেকে বাংলাদেশ দেখুন। ২০২৫ সালে যে সবুজ দেখতে পাচ্ছেন, ২০৪০ সালে সেটার কতটুকু থাকবে? যে হারে কৃষিজমি হারাচ্ছি, মাটি মরছে, সার দিয়ে ক্ষতিপূরণ করতে গিয়ে আরো ক্ষতি হচ্ছে, সেই হারে চলতে থাকলে বাংলাদেশ কি নিজের মানুষকে খাওয়াতে পারবে?
চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা একটা বিশাল অর্জন। কিন্তু সেই অর্জনের ভিত্তি, মাটি, সেটা ভেঙে পড়ছে। আর আমরা ভর্তুকি দিয়ে সার কিনে, আমদানি করে খাদ্যের ঘাটতি পূরণ করে, একটা মিথ্যা নিরাপত্তার বোধে বসে আছি।
একজন কৃষক যখন তার ক্লান্ত মাটিতে আরো এক বস্তা ইউরিয়া ঢেলে দেয়, সে জানে না যে সে মাটিকে আরেকটু মেরে ফেলছে। তার দোষ না। তাকে কেউ শেখায়নি। তাকে বিকল্প দেয়নি। তাকে সস্তা সার দিয়ে বলেছে, "এটা দাও, ফসল হবে।" আর ফসল হচ্ছে, এখনো হচ্ছে। কিন্তু কতদিন?
প্রশ্নটা এটা না যে বাংলাদেশের মাটি শেষ হবে কিনা। প্রশ্নটা হলো: আমরা কি মাটি শেষ হওয়ার আগে জেগে উঠবো, নাকি শেষ হওয়ার পরে?