বর্জ্যের ব্যবসা: টোকাই থেকে রিসাইক্লিং
পর্ব ১: ভোরের আঁধারে
ভোর সাড়ে চারটা। মিরপুরের রাস্তায় এখনো অন্ধকার। বারো বছরের রাজু একটা বড় বস্তা কাঁধে নিয়ে হাঁটছে। খালি পায়ে। হাতে একটা লম্বা লোহার হুক। সে ডাস্টবিনে, রাস্তার পাশে, নর্দমার ধারে ময়লা ঘাঁটছে। প্লাস্টিকের বোতল, কাগজ, টিনের ক্যান, পুরনো ব্যাটারি, যা কিছু বিক্রি করা যায়, সব আলাদা করে বস্তায় ভরছে।
রাজু একজন "টোকাই"। এই শব্দটা বাংলাদেশে গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু রাজু এবং তার মতো আরো লক্ষাধিক মানুষ প্রতিদিন যে কাজটা করে, সেটা ছাড়া ঢাকা শহর আরো আগেই ডুবে যেত ময়লায়।
ঢাকা শহরে প্রতিদিন কী পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়? এই চার্টটা দেখুন:
২০১০ সালে ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩,৫০০ টন বর্জ্য তৈরি হতো। ২০২৫ সালে সেটা ৬,৫০০ টনের বেশি। পনেরো বছরে প্রায় দ্বিগুণ। জনসংখ্যা বেড়েছে, ভোগ বেড়েছে, প্যাকেজিং বেড়েছে। কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একই জায়গায় আটকে আছে।
এই বর্জ্যের সবটা কি সংগ্রহ করা হয়? মোটেও না। এই চার্টটা দেখুন:
ঢাকায় মোট বর্জ্যের মাত্র ৫০-৫৫% সংগ্রহ করা হয়। বাকি ৪৫-৫০%? রাস্তায় পড়ে থাকে, নর্দমায় যায়, নদীতে যায়, খোলা জায়গায় পচে। তুলনায় সিঙ্গাপুর সংগ্রহ করে ১০০%, টোকিও ৯৯%, এমনকি দিল্লিও ৭০% এর বেশি সংগ্রহ করে। ঢাকা এই তালিকায় একেবারে নিচের দিকে।
এই অসংগৃহীত ময়লার মধ্যেই রাজু তার রুটি খুঁজে পায়। সে জানে না সে আসলে একটা অদৃশ্য অর্থনীতির অংশ।
পর্ব ২: ময়লার ভেতরে কী আছে?
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে ময়লার মধ্যে আসলে কী থাকে। এটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সব ময়লা এক রকম না। এই চার্টটা দেখুন:
ঢাকার বর্জ্যের প্রায় ৬২% হলো জৈব বর্জ্য, মানে খাবারের উচ্ছিষ্ট, সবজির খোসা, পচনশীল জিনিস। প্লাস্টিক ১২%, কাগজ ৯%, কাপড় ৪%, ধাতু ২%, কাচ ২%, আর বাকি ৯% বিবিধ। উন্নত দেশে জৈব বর্জ্যের হার ৩০-৩৫%, আর প্লাস্টিক ও কাগজ অনেক বেশি। বাংলাদেশে জৈব বর্জ্য বেশি হওয়ায় কম্পোস্ট তৈরির বিশাল সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো হচ্ছে না।
প্লাস্টিক, কাগজ, ধাতু, কাচ, এগুলো সব রিসাইক্লেবল। মোট বর্জ্যের প্রায় ২৫-৩০% রিসাইক্লেবল উপাদান। এই উপাদানগুলোর বাজারমূল্য আছে। আর এখানেই টোকাইদের ভূমিকা শুরু হয়।
পর্ব ৩: অদৃশ্য শ্রমিক
বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রাহকদের সংখ্যা কত? সঠিক হিসাব কারো কাছে নেই। কারণ তারা কোনো রেজিস্ট্রিতে নেই, কোনো আদমশুমারিতে নেই। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণা থেকে একটা চিত্র তৈরি করা যায়। এই চার্টটা দেখুন:
শুধু ঢাকায় আনুমানিক ১ লাখের বেশি মানুষ অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহের সাথে যুক্ত। সারা দেশে এই সংখ্যা ৪ লাখের কাছাকাছি। এদের মধ্যে আছে টোকাই (রাস্তা থেকে ময়লা কুড়ানো), ভাঙ্গারি দোকানদার (কেনাবেচা), আর ফেরিওয়ালা (বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুরনো জিনিস কেনা)। এই পুরো ব্যবস্থাটা সরকারি কোনো পরিকল্পনার অংশ না। এটা নিজে নিজে তৈরি হয়েছে, দারিদ্র্যের চাপে।
এই মানুষগুলো কত আয় করে? এই চার্টটা দেখুন:
একজন টোকাই দিনে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করে। ভাঙ্গারি দোকানদার ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা। ফেরিওয়ালা ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। মিডলম্যান বা মধ্যস্বত্বভোগী ১,০০০ থেকে ২,০০০ টাকা। চেইনের একদম নিচে যারা, তাদের আয় সবচেয়ে কম, ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। রাজু দিনে ২৫০ টাকা আয় করে। মাসে সাত-আট হাজার। এই টাকায় সে, তার মা আর দুই বোন চলে। তার বাবা দুই বছর আগে মারা গেছে, নৌকাডুবিতে।
কিন্তু আয়ের চেয়ে বড় বিষয় হলো স্বাস্থ্য ঝুঁকি। এই চার্টটা দেখুন:
একটা গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রাহকদের ৭৮% শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভোগে। ৬৫% চর্মরোগে আক্রান্ত। ৫২% পরিপাকতন্ত্রের সমস্যায় ভোগে। ৪৫% পেশি ও হাড়ের ব্যথায় কাতর। ৩৮% চোখের সমস্যায় ভোগে। তারা খালি হাতে ময়লা ঘাঁটে। মাস্ক নেই, গ্লাভস নেই, জুতা নেই। সুচ, ভাঙা কাচ, মেডিকেল বর্জ্য, সব কিছুর সাথে প্রতিদিন তাদের যোগাযোগ। একটা ছোট কাটা সংক্রমণে পরিণত হতে পারে, আর হাসপাতালে যাওয়ার টাকা নেই।
এই মানুষগুলো শহরের জন্য কী করছে? তারা মোট বর্জ্যের ১৫-২০% রিসাইক্লযোগ্য উপাদান আলাদা করে বের করছে। এটা না হলে ল্যান্ডফিলে আরো ১,০০০-১,৩০০ টন বর্জ্য যেত প্রতিদিন। সরকারের কোটি কোটি টাকা বাঁচছে এই মানুষদের বিনামূল্যের শ্রমের কারণে। কিন্তু বিনিময়ে তারা পাচ্ছে রোগ, অবহেলা, আর "টোকাই" গালি।
পর্ব ৪: ল্যান্ডফিলের সংকট
যে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়, সেটা যায় কোথায়? ল্যান্ডফিলে। ঢাকার প্রধান ল্যান্ডফিল আমিনবাজারে, সাভারের কাছে। আরেকটা মাতুয়াইলে। কিন্তু এগুলো কোনো আধুনিক ল্যান্ডফিল না। স্যানিটারি ল্যান্ডফিল বলতে যা বোঝায় (লাইনার, লিচেট ট্রিটমেন্ট, গ্যাস ক্যাপচার), তার কিছুই নেই। এগুলো মূলত খোলা ডাম্পিং সাইট।
আমিনবাজার ল্যান্ডফিল ২০০৭ সালে চালু হয়েছিল ৫০ একর জায়গায়। ধারণক্ষমতা ছিল ১৫ বছরের বর্জ্য ধারণের। সেই ১৫ বছর কবেই পার হয়ে গেছে। এখন এটা তার ধারণক্ষমতার অনেক ওপরে। ময়লার পাহাড় ৫০ ফুটের বেশি উঁচু। বর্ষায় লিচেট (দূষিত পানি) বের হয়ে আশপাশের নদী ও জলাশয়ে মেশে। আশপাশের গ্রামের মানুষ দুর্গন্ধে বাঁচতে পারে না। চামড়ার রোগ, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, নিত্যসঙ্গী।
ঢাকার জন্য নতুন ল্যান্ডফিল দরকার, কিন্তু কেউ নিজের এলাকায় ল্যান্ডফিল চায় না। এটাকে বলে NIMBY (Not In My Backyard) সমস্যা। আর ল্যান্ডফিলই কি একমাত্র উত্তর? উন্নত দেশগুলো ল্যান্ডফিল থেকে সরে আসছে। সুইডেন তার বর্জ্যের মাত্র ১% ল্যান্ডফিলে পাঠায়। জাপান ২%। বাকিটা? রিসাইক্লিং, কম্পোস্টিং, এনার্জি রিকভারি।
বাংলাদেশ কত শতাংশ বর্জ্য রিসাইক্লিং করে? এই চার্টটা দেখুন:
আনুষ্ঠানিকভাবে, বাংলাদেশের রিসাইক্লিং রেট মাত্র ৫-৮%। অনানুষ্ঠানিক খাত (টোকাই, ভাঙ্গারি) ধরলে ১৫-২০%। দক্ষিণ কোরিয়া ৫৯%, জার্মানি ৬৭%, সুইডেন ৪৯%। আমরা যেখানে আছি, সেখান থেকে তাদের জায়গায় যেতে দশকের পর দশক লাগবে। কিন্তু শুরু করতে হবে।
পর্ব ৫: সরকার কত খরচ করে?
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটা ব্যয়বহুল কাজ। পৃথিবীর সব শহরেই পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের বাজেটের একটা বড় অংশ যায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়। ঢাকায় কত যায়? এই চার্টটা দেখুন:
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন মিলিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বছরে প্রায় ৮০০ থেকে ১,০০০ কোটি টাকা খরচ করে। শুনতে অনেক মনে হতে পারে, কিন্তু মাথাপিছু হিসাবে এটা বছরে মাত্র ৫০০ টাকা (প্রায় ৪.৫ ডলার)। সিঙ্গাপুর মাথাপিছু ১২০ ডলার খরচ করে, টোকিও ৯০ ডলার, এমনকি দিল্লি পর্যন্ত ১২ ডলার খরচ করে। ঢাকার বাজেটে পুরো সংগ্রহই ঠিকমতো হয় না, রিসাইক্লিং বা আধুনিক প্রযুক্তির কথা তো দূরের।
পর্ব ৬: ব্রাজিলের পথ, বাংলাদেশের সম্ভাবনা
বর্জ্য সংগ্রাহকদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ব্রাজিল পৃথিবীর সবচেয়ে সফল মডেল তৈরি করেছে। ব্রাজিলে এদের বলে "catadores"। বাংলাদেশের টোকাইদের মতোই তারা রাস্তা থেকে ময়লা কুড়াতো। কিন্তু ব্রাজিল সরকার তাদের পেশাদার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের সমবায় গঠনে সাহায্য করেছে। পৌরসভার সাথে চুক্তি করে দিয়েছে। ফলাফল? ব্রাজিলে ৮ লাখের বেশি catador এখন সংগঠিতভাবে কাজ করে, তাদের আয় তিনগুণ বেড়েছে, আর দেশের রিসাইক্লিং রেট ৩০% এর ওপরে উঠেছে।
এই চার্টটা দেখুন। জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়ার কথা বাদ দিন, ওরা অনেক ধনী দেশ। কিন্তু ব্রাজিল? ব্রাজিলের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের চেয়ে চারগুণ বেশি, সত্য। কিন্তু ব্রাজিল যখন catador আন্দোলন শুরু করেছিল ১৯৯০-এর দশকে, তখন তাদের অবস্থা বাংলাদেশের এখনকার অবস্থার চেয়ে খুব বেশি ভালো ছিল না। পরিবর্তনটা এসেছে নীতি থেকে, সম্পদ থেকে না।
বাংলাদেশের জন্য কী করা দরকার?
প্রথমত, অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রাহকদের পেশাদার স্বীকৃতি দেওয়া। তারা "টোকাই" না, তারা রিসাইক্লিং শ্রমিক। তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া, স্বাস্থ্যবিমা দেওয়া, ন্যূনতম সুরক্ষা সরঞ্জাম (গ্লাভস, মাস্ক, জুতা) দেওয়া। এই খরচ নগণ্য। ১ লাখ মানুষের জন্য বছরে ৫০ কোটি টাকাতেই সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, উৎসে বর্জ্য আলাদা করা বাধ্যতামূলক করা। প্রতিটা বাড়ি, অফিস, দোকানে তিনটা আলাদা পাত্র: জৈব, রিসাইক্লেবল, আর বাকি। দক্ষিণ কোরিয়া এটা ১৯৯৫ সালে শুরু করেছিল। ত্রিশ বছরে তাদের রিসাইক্লিং রেট ১৫% থেকে ৫৯% এ উঠেছে।
তৃতীয়ত, জৈব বর্জ্য দিয়ে কম্পোস্ট তৈরি। ঢাকার ৬২% বর্জ্য জৈব। এটা কম্পোস্ট করে সার তৈরি করা যায়, বায়োগ্যাস তৈরি করা যায়। কৃষি খাতে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকার রাসায়নিক সার আমদানি করে। জৈব কম্পোস্ট সেই চাহিদার একটা অংশ মেটাতে পারে।
চতুর্থত, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ। ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্রযুক্তি পৃথিবীর অনেক দেশে চালু আছে। সুইডেন তার বর্জ্যের ৫০% থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করে। ঢাকায় প্রতিদিন ৬,৫০০ টন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এর একটা অংশ থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করা সম্ভব। DSCC ইতিমধ্যে একটি ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্ল্যান্টের পরিকল্পনা করছে, কিন্তু অগ্রগতি ধীর।
আসুন শেষ করি যেখান থেকে শুরু করেছিলাম।
রাজু প্রতিদিন ভোর সাড়ে চারটায় উঠে ময়লা কুড়ায়। সে জানে না সে একটা ১০,০০০ কোটি টাকার অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ। সে জানে না সে ঢাকাকে প্রতিদিন ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাচ্ছে। সে জানে না ব্রাজিলে তার মতো মানুষদের সরকারি স্বীকৃতি আছে, স্বাস্থ্যবিমা আছে, সমবায় আছে।
রাজু শুধু জানে, আজ যদি ১৫-২০ কেজি প্লাস্টিক আর কাগজ জোগাড় করতে পারে, তাহলে ২৫০ টাকা পাবে। সেই টাকায় চাল কিনবে। মা আর বোনেরা খাবে।
ঢাকায় প্রতিদিন ৬,৫০০ টনের বেশি ময়লা তৈরি হচ্ছে। এর অর্ধেক রাস্তায় পচছে। ল্যান্ডফিল ভরে উপচে পড়ছে। আর লক্ষ লক্ষ রাজু খালি হাতে, খালি পায়ে, বিনা সুরক্ষায় সেই ময়লা থেকে সোনা খুঁজছে।
এটা শুধু বর্জ্যের সমস্যা না। এটা একটা নীতিগত ব্যর্থতা। যে দেশ গার্মেন্টস শিল্পে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক হতে পারে, সেই দেশ তার ময়লা সংগ্রহ করতে পারে না, এটা সক্ষমতার সমস্যা না। এটা অগ্রাধিকারের সমস্যা।
পরিবর্তন সম্ভব। ব্রাজিল করেছে, দক্ষিণ কোরিয়া করেছে, এমনকি রুয়ান্ডা পর্যন্ত তার রাজধানী কিগালিকে আফ্রিকার সবচেয়ে পরিষ্কার শহর বানিয়েছে। বাংলাদেশ পারে না, এটা সত্যি না। বাংলাদেশ শুরু করেনি, এটাই সত্যি।
আর শুরু করার প্রথম ধাপ? রাজুকে "টোকাই" বলা বন্ধ করা। তাকে রিসাইক্লিং শ্রমিক বলা। তার হাতে গ্লাভস দেওয়া। তার কাজের মূল্য স্বীকার করা। কারণ সে যে কাজটা করছে, সেটা ছাড়া এই শহর চলবে না।