পানি যখন উঠবে
পর্ব ১: সাতক্ষীরার সেই পরিবার
রহিমার বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায়। নদীর পাড় থেকে মাত্র দুইশো মিটার। ত্রিশ বছর আগে এই দূরত্ব ছিল প্রায় আধা কিলোমিটার। নদী এগিয়ে আসছে। প্রতি বছর একটু একটু করে।
রহিমার স্বামী কাদের মিয়া আগে ধান চাষ করতো। দুই বিঘা জমি ছিল। পাঁচ বছর আগে লোনা পানি ঢুকে গেলো জমিতে। ধান আর হয় না। মাটিতে লবণের সাদা দাগ, যেন কেউ চুন ছড়িয়ে দিয়েছে। কাদের মিয়া এখন চিংড়ি ঘেরে কাজ করে, অন্যের ঘেরে, দিনমজুর হিসেবে। নিজের জমি আছে, কিন্তু সেই জমিতে কিছু ফলে না।
গত বছর আইলা স্মরণ দিবসে রহিমা বলেছিল, "আইলার সময় সব ডুবে গেছিল। মানুষ বলেছিল ঠিক হয়ে যাবে। ঠিক হয়নি। পানি নেমে গেছে, লবণ থেকে গেছে।"
রহিমার গ্রামে একসময় দুইশো পরিবার ছিল। এখন আছে একশো তিরিশ। বাকিরা কোথায় গেছে? ঢাকায়। খুলনায়। কেউ কেউ চট্টগ্রামে। জলবায়ু শরণার্থী, যদিও এই শব্দটা কেউ ব্যবহার করে না। তারা শুধু "শহরে গেছে কাজের খোঁজে।"
রহিমার বড় ছেলে ঢাকায় রিকশা চালায়। কড়াইলে থাকে, একটা ঘরে চারজন। সে চলে গেছে কারণ গ্রামে আর কোনো কাজ নেই। জমিতে ফসল হয় না, নদীতে মাছ কমে গেছে, পুকুরের পানি লোনা।
এটা একটা পরিবারের গল্প। কিন্তু এটা আসলে বাংলাদেশের গল্প। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন এই দেশটাকে যেভাবে বদলে দিচ্ছে, সেটা বুঝতে হলে রহিমার চোখ দিয়ে দেখতে হবে। সংখ্যা দিয়ে নয়, অভিজ্ঞতা দিয়ে।
তবে সংখ্যাগুলোও জানা দরকার। কারণ সংখ্যা ছাড়া বোঝা যায় না সমস্যাটা কতটা বড়।
পর্ব ২: তথ্য যা বলছে
বাংলাদেশ গরম হচ্ছে। এটা অনুভূতি না, পরিমাপযোগ্য বাস্তবতা। ১৯৭০ সাল থেকে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। সংখ্যাটা ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু বৈশ্বিক গড় বৃদ্ধি ১.১ ডিগ্রি। মানে বাংলাদেশ বিশ্ব গড়ের চেয়ে দ্রুত গরম হচ্ছে।
এই চার্টটা দেখুন:
প্রতিটা বার একটা বছরের গড় তাপমাত্রা বিচ্যুতি দেখাচ্ছে। লাল বার মানে স্বাভাবিকের চেয়ে গরম। ড্যাশ লাইনটা প্রবণতা দেখাচ্ছে। প্রবণতা স্পষ্ট: ওপরের দিকে। ১৯৭০-এর দশকে বিচ্যুতি ছিল শূন্যের কাছাকাছি। ২০২০-এর দশকে এটা ১ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে। আর এটা থামছে না।
তাপমাত্রা বাড়লে কী হয়? বৃষ্টির ধরন বদলায়। যখন বৃষ্টি হয়, তখন অনেক বেশি হয়। যখন হয় না, তখন একেবারে শুকনো। মৌসুমি বায়ু অনিয়মিত হচ্ছে। বর্ষা আগে আসছে, দেরিতে যাচ্ছে, কখনো হঠাৎ থেমে যাচ্ছে। কৃষক বুঝতে পারছে না কখন বীজ বপন করবে।
আর বন্যা? এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশে বড় বন্যার সংখ্যা দশকে দশকে বাড়ছে। ১৯৭০-এর দশকে তিনটা বড় বন্যা। ২০১০-এর দশকে আটটা। ১৯৯৮ সালের বন্যা দেশের দুই-তৃতীয়াংশ ডুবিয়ে দিয়েছিল। ২০০৪ সালে আবার। ২০১৭ সালে আবার। ২০২২ সালে সিলেটের বন্যা ছিল অভূতপূর্ব। স্থানীয় মানুষ বলেছে, "এমন বন্যা কোনোদিন দেখিনি।" এই কথাটা এখন প্রতি কয়েক বছরে শোনা যায়।
শুধু বন্যা না। ঘূর্ণিঝড়ও তীব্র হচ্ছে।
ক্যাটাগরি ৩ বা তার বেশি মাত্রার ঘূর্ণিঝড়, মানে যেগুলো ব্যাপক ধ্বংস করতে পারে, সেগুলোর সংখ্যা বাড়ছে। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় ভোলায় ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। ১৯৯১ সালে চট্টগ্রামে ১.৩৮ লাখ। ২০০৭ সালে সিডর, ২০০৯ সালে আইলা, ২০২০ সালে আম্ফান। প্রতিটা ঘূর্ণিঝড় বলছে একই কথা: সমুদ্র রেগে আছে, আর তার রাগ বাড়ছে।
উষ্ণ সমুদ্র মানে বেশি শক্তি। বেশি শক্তি মানে বেশি তীব্র ঝড়। বেশি তীব্র ঝড় মানে বেশি জলোচ্ছ্বাস। বেশি জলোচ্ছ্বাস মানে বেশি লোনা পানি। বেশি লোনা পানি মানে বেশি ফসল নষ্ট, বেশি পানীয় জলের সংকট, বেশি বাস্তুচ্যুতি।
একটা শৃঙ্খল। প্রতিটা আংটা পরেরটাকে আরো খারাপ করছে।
পর্ব ৩: সমুদ্র আসছে
জলবায়ু পরিবর্তনের সব হুমকির মধ্যে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। কারণটা ভূগোল। বাংলাদেশের বেশিরভাগ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র কয়েক মিটার উঁচুতে। দক্ষিণের উপকূলীয় জেলাগুলো, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, এগুলো প্রায় সমুদ্রের সমান উচ্চতায়।
এখন IPCC-র হিসাব দেখুন। তিনটা সিনারিও আছে:
০.৫ মিটার বাড়লে ৮ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। এটা ২০৫০ সালের মধ্যে হতে পারে, মাত্র ২৪ বছর পরে। ১ মিটার বাড়লে ১৭ মিলিয়ন। এটা একটা মাঝারি দেশের পুরো জনসংখ্যা। নেদারল্যান্ডসের জনসংখ্যা ১৭ মিলিয়ন। ১.৫ মিটার বাড়লে ৩০ মিলিয়ন। বাংলাদেশের পাঁচজনে একজন।
এই মানুষগুলো কোথায় যাবে? ঢাকায়? ঢাকা এরই মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটা। চট্টগ্রামে? চট্টগ্রাম নিজেই উপকূলীয় শহর, সেখানেও ঝুঁকি আছে। ভারতে? সীমান্ত বন্ধ।
আর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার আগেই লোনা পানি ঢুকে যাচ্ছে ভেতরে। এটাকে বলে saltwater intrusion. সমুদ্রের লোনা পানি নদী বেয়ে, মাটির নিচ দিয়ে, ধীরে ধীরে উত্তরে এগিয়ে আসছে। গত ত্রিশ বছরে লবণাক্ততার সীমানা প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উত্তরে চলে এসেছে। যেসব জমিতে আগে ধান হতো, সেখানে এখন কিছু হয় না।
আর এই সবকিছুর প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরবন।
সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন। এটা শুধু একটা বন না। এটা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঢাল। প্রতিটা ঘূর্ণিঝড়ে সুন্দরবন জলোচ্ছ্বাসের গতি কমায়। আইলার সময় খুলনা শহর যতটুকু রক্ষা পেয়েছিল, তার বড় কৃতিত্ব সুন্দরবনের। কিন্তু সুন্দরবন নিজেই সংকটে।
১৯৭০ সালে সুন্দরবনের আয়তন ছিল প্রায় ৬,৫০০ বর্গ কিলোমিটার। এখন ৫,৭০০। পঞ্চাশ বছরে ৮০০ বর্গ কিলোমিটার কমেছে। কমার কারণ তিনটা: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, আর মানুষের আগ্রাসন। সুন্দরী গাছ, যার নামে সুন্দরবন, সেই গাছ মরে যাচ্ছে। কারণ লবণাক্ততা বেড়ে গেছে যে মাত্রায়, সুন্দরী সেটা সহ্য করতে পারে না।
একটা ভয়ংকর সম্ভাবনা আছে: সুন্দরবন যদি একটা নির্দিষ্ট সীমার বাইরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে পুরো বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়তে পারে। গাছ মরলে মাটি ধরে রাখার কেউ থাকে না। মাটি ক্ষয়ে গেলে পানি ঢোকে। পানি ঢুকলে আরো গাছ মরে। এটাকে বলে tipping point. আর বিজ্ঞানীরা বলছেন, সুন্দরবন সেই পয়েন্টের কাছাকাছি।
সুন্দরবন হারালে বাংলাদেশ তার প্রাকৃতিক ঢাল হারাবে। প্রতিটা ঘূর্ণিঝড় সরাসরি আঘাত করবে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরায়। জলোচ্ছ্বাস আরো গভীরে ঢুকবে। লোনা পানি আরো উত্তরে যাবে।
পর্ব ৪: অন্যায়
এবার একটা সংখ্যা দেখুন যেটা পুরো চিত্রটাকে একটা ভিন্ন আলোয় দেখাবে।
বাংলাদেশের মাথাপিছু কার্বন নির্গমন ০.৫ টন। যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ টন। চীনের ৮ টন। বিশ্ব গড় ৪.৫ টন। ভারতের ২ টন।
মানে একজন আমেরিকান যে পরিমাণ কার্বন নির্গমন করে, সেটা ২৮ জন বাংলাদেশির সমান। চীনের একজন নাগরিক ১৬ জন বাংলাদেশির সমান।
জলবায়ু পরিবর্তন ঘটাচ্ছে শিল্পোন্নত দেশগুলো। মূল্য দিচ্ছে বাংলাদেশ।
এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অন্যায়গুলোর একটা। যারা সবচেয়ে কম দায়ী, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশ শিল্প বিপ্লবে অংশ নেয়নি। কয়লা পুড়িয়ে সম্পদ তৈরি করেনি। কিন্তু কয়লা পোড়ানোর ফল ভোগ করছে। রহিমার জমিতে লবণ ঢুকেছে কারণ কোনো আমেরিকান বা ইউরোপীয় কারখানা বায়ুমণ্ডলে কার্বন ছেড়েছে।
এই অন্যায়ের মাশুল কত? দেখুন কৃষিতে কত ক্ষতি হচ্ছে:
প্রতি বছর জলবায়ু দুর্যোগে বাংলাদেশের ফসলের ক্ষতি হচ্ছে গড়ে প্রায় ৩০ বিলিয়ন টাকা। কোনো কোনো বছর ৪০ বিলিয়নের বেশি। ২০২৫ সালে ৪৫ বিলিয়ন টাকা। এটা শুধু সরাসরি ফসলের ক্ষতি। এর সাথে যোগ করুন বাড়িঘর ভাঙা, রাস্তা নষ্ট হওয়া, পানীয় জলের উৎস দূষিত হওয়া, স্কুল ডুবে যাওয়া, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। তাহলে সংখ্যাটা আরো অনেক বড়।
আর এই ক্ষতির ফলে কী হচ্ছে? মানুষ সরে যাচ্ছে।
প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে ২০ থেকে ৪০ লাখ মানুষ জলবায়ুজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। কেউ অস্থায়ীভাবে, বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে আবার ফিরে আসছে। কেউ স্থায়ীভাবে, গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাচ্ছে। ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ২,০০০ মানুষ আসে, তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ জলবায়ু শরণার্থী।
তারা আসে কড়াইলে, কল্যাণপুরে, মিরপুরের বস্তিতে। দিনমজুর হয়, রিকশা চালায়, গার্মেন্টসে কাজ করে। গ্রামে ফেলে আসা জমি, পুকুর, বাড়ি, সব হারিয়ে শূন্য হাতে শহরে এসে নতুন করে শুরু। কিন্তু শহর তাদের জন্য তৈরি না। বাসযোগ্য জায়গা নেই, পরিষ্কার পানি নেই, স্বাস্থ্যসেবা নেই।
এটা একটা দুষ্টচক্র। জলবায়ু পরিবর্তন গ্রাম থেকে মানুষকে তাড়াচ্ছে। শহর তাদের ধারণ করতে পারছে না। তারা আরো দরিদ্র হচ্ছে। দরিদ্র হলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়ার ক্ষমতা আরো কমে যায়।
আর এই পুরো পরিস্থিতিতে আঞ্চলিকভাবে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে?
ND-GAIN সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটা। আমাদের প্রতিবেশীদের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে। মালদ্বীপ, মিয়ানমার, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, সবার চেয়ে বাংলাদেশ বেশি ঝুঁকিতে। কারণ শুধু ভূগোল না। ঝুঁকি নির্ভর করে তিনটা জিনিসের ওপর: এক্সপোজার (কতটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে), সেনসিটিভিটি (কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা), আর অ্যাডাপটিভ ক্যাপাসিটি (মোকাবেলা করার সক্ষমতা)। বাংলাদেশ তিনটাতেই খারাপ।
পর্ব ৫: কী করা যায়?
গল্পটা এখানেই শেষ করলে হতাশায় ডুবে যেতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ আসলে জলবায়ু অভিযোজনে কিছু কাজ করেছে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি, যেটা ১৯৭০ সালে ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু থেকে ২০২০ সালে আম্ফানে মাত্র ২৬ জনের মৃত্যুতে নামিয়ে এনেছে। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, যেটা পৃথিবীর অন্যতম সেরা। লবণসহিষ্ণু ধান উদ্ভাবন, যেটা BRRI বিজ্ঞানীদের অসাধারণ কাজ। উপকূলীয় বনায়ন, যেটা ছোট পরিসরে হলেও হচ্ছে।
কিন্তু যথেষ্ট হচ্ছে না। এবার দেখুন কেন:
বাংলাদেশ জলবায়ু অভিযোজনে জিডিপির ০.৮% ব্যয় করে। প্রয়োজন ২.৫%। অর্থাৎ যা দরকার তার তিন ভাগের একভাগ খরচ করা হচ্ছে। গ্যাপটা বিশাল। আর উন্নত দেশগুলো যে ক্লাইমেট ফাইন্যান্স দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটা এখনো বেশিরভাগ কাগজে আছে। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে প্রতিশ্রুতি ছিল বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার। বাস্তবে কত এসেছে? আনুমানিক ৮০-৯০ বিলিয়ন, তারমধ্যে বেশিরভাগ ঋণ, অনুদান না। আর বাংলাদেশ পায় তার একটা ক্ষুদ্র অংশ।
এই চার্টটা ND-GAIN-এর ঝুঁকি বনাম প্রস্তুতি ম্যাপ। বাংলাদেশ আছে উপরের বাম দিকে: বেশি ঝুঁকি, কম প্রস্তুতি। এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, এমনকি শ্রীলঙ্কাও বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে।
তাহলে কী করতে হবে? তিনটা জিনিস।
প্রথমত, অভ্যন্তরীণ অভিযোজন বাজেট তিন গুণ করতে হবে। জিডিপির ০.৮% থেকে ২.৫%-এ নিয়ে যেতে হবে। এই টাকা কোথায় যাবে? বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ শক্তিশালী করা। লবণসহিষ্ণু ফসলের গবেষণা ও সম্প্রসারণ। উপকূলীয় এলাকায় পানীয় জলের ব্যবস্থা (রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং, ডিস্যালিনেশন)। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা দ্বিগুণ করা। জলবায়ু-সহিষ্ণু অবকাঠামো নির্মাণ।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরো জোরালো হতে হবে। বাংলাদেশ Climate Vulnerable Forum-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এটা ভালো। কিন্তু যথেষ্ট না। Loss and Damage তহবিল থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য অংশ আদায় করতে হবে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি শুধু সম্মেলনে বক্তৃতায় না, আন্তর্জাতিক আদালতে, বাণিজ্য আলোচনায়, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তুলতে হবে। যারা কার্বন নির্গমন করেছে, তাদের মূল্য দিতে হবে। এটা দান না, এটা ক্ষতিপূরণ।
তৃতীয়ত, পরিকল্পিত স্থানান্তর। ৩০ মিলিয়ন মানুষ যদি উপকূল থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়, সেটা যেন বিশৃঙ্খলভাবে না হয়। এখন থেকেই পরিকল্পনা দরকার। কোন শহরে কতটুকু ধারণক্ষমতা বাড়ানো যায়? নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল কোথায় তৈরি করা যায়? উপকূলীয় মানুষের জন্য বিকল্প জীবিকা কী হতে পারে? নেদারল্যান্ডস সমুদ্রের সাথে লড়াই করে জিতেছে ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়ে। বাংলাদেশের সেই সম্পদ নেই, কিন্তু পরিকল্পনা তো করতে পারে।
সুন্দরবন রক্ষা করতে হবে। এটা শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব না, এটা জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। সুন্দরবন ছাড়া উপকূলে কোনো প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা থাকবে না। বনায়ন বাড়াতে হবে, অবৈধ কাটা বন্ধ করতে হবে, আর সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
আসুন ফিরে যাই সাতক্ষীরায়। রহিমার কাছে।
রহিমা জানে না IPCC কী। জানে না ND-GAIN সূচক কী। জানে না COP সম্মেলনে কী আলোচনা হয়। কিন্তু সে জানে তার জমিতে লবণ ঢুকেছে। জানে নদী কাছে চলে এসেছে। জানে তার ছেলেকে ঢাকায় যেতে হয়েছে। জানে গত বছর ঘূর্ণিঝড়ে তার টিনের চালা উড়ে গেছে।
রহিমা একটা সংখ্যা। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের কাছে সে একটা "affected population"-এর অংশ। নীতিনির্ধারকদের কাছে সে "vulnerable community"-এর সদস্য। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তার জীবন একটা পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইড। কিন্তু রহিমা একজন মানুষ। তার একটা নাম আছে, একটা পরিবার আছে, একটা গল্প আছে।
বাংলাদেশে রহিমার মতো কোটি কোটি মানুষ আছে। তাদের জমি ডুবছে, পানি লোনা হচ্ছে, ঘর ভাঙছে, জীবিকা শেষ হচ্ছে। তারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ না, কিন্তু তারা এর শিকার।
পানি উঠছে। আর পানি যখন উঠবে, রহিমারা কোথায় যাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরকেই দিতে হবে। এখন। কাল হলে দেরি হয়ে যাবে।
কারণ সমুদ্র অপেক্ষা করে না।