পাহারাদারকে কে পাহারা দেবে?
পর্ব ১: একটা জমির দলিল
করিম সাহেবের বাবা মারা গেছেন ছয় মাস আগে। সিলেটে বাবার নামে দুই বিঘা জমি আছে। এখন জমিটা নিজের নামে করতে হবে। সোজা কাজ, তাই না?
করিম সাহেব সকাল আটটায় ভূমি অফিসে গেলেন। সেখানে গিয়ে জানলেন, প্রথমে ওয়ারিশ সনদ লাগবে। সেটার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদে গেলেন, চেয়ারম্যান বললেন "পরে আসেন"। পরে মানে কবে? "দেখি।" একজন দালাল এসে কানে কানে বললো, "৫,০০০ টাকা দিলে আজই হয়ে যাবে।" দিলেন। হয়ে গেলো।
এরপর ভূমি অফিসে ফিরে গেলেন। সেখানে পেশকার বললেন, "ফাইল খুঁজে পাচ্ছি না।" আরেকজন দালাল এলো। "১০,০০০ টাকা দিলে ফাইল পেয়ে যাবো।" দিলেন। ফাইল পাওয়া গেলো। তারপর নামজারি আবেদন। সেটার জন্য সার্ভেয়ার যাবে জমি দেখতে। সার্ভেয়ার বললেন, "গাড়ি ভাড়া লাগবে।" ২,০০০ টাকা। গাড়ি ভাড়া দেওয়ার পরও সার্ভেয়ার দুই মাস গেলেন না। আবার দালাল। আরো ৫,০০০ টাকা। সার্ভেয়ার গেলেন, রিপোর্ট দিলেন। তারপর সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে শুনানি। শুনানির তারিখ পড়লো তিন মাস পরে। শুনানিতে গেলেন, বিপক্ষ হাজির হয়নি। পরবর্তী তারিখ আরো দুই মাস পর।
মোট সময়: ছয় মাস, এখনো শেষ হয়নি। মোট আনুষ্ঠানিক খরচ: ১,২০০ টাকা। মোট অনানুষ্ঠানিক খরচ (ঘুষ): ৪২,০০০ টাকা। করিম সাহেবের বাবার জমি। তার আইনি অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার পেতে তাকে ঘুষ দিতে হচ্ছে, দালালের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে, মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে।
এটা কোনো ব্যতিক্রম না। এটা বাংলাদেশের দৈনন্দিন বাস্তবতা। জমির দলিল, পাসপোর্ট, ট্রেড লাইসেন্স, বিদ্যুৎ সংযোগ, পুলিশ রিপোর্ট। প্রতিটা সরকারি সেবায় একটা অদৃশ্য "ফি" আছে যেটা কোনো রসিদে লেখা থাকে না।
প্রশ্ন হলো: এটা কতটা গভীর? শুধু কি ভূমি অফিসের সমস্যা, নাকি পুরো ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়ছে? সংখ্যা কী বলে?
পর্ব ২: গণতন্ত্র সংখ্যায়
বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে কথা বললে দুটো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। একদল বলে, "গণতন্ত্র আছে, নির্বাচন হয়, সংসদ চলে।" আরেকদল বলে, "কীসের গণতন্ত্র, সব নাটক।" দুটোই আবেগের কথা। ডেটা কী বলে, সেটা দেখা যাক।
সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের V-Dem (Varieties of Democracy) ইন্সটিটিউট পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্তৃত গণতন্ত্র পরিমাপ প্রকল্প চালায়। তারা ২০০টার বেশি দেশের গণতন্ত্রের মান পরিমাপ করে, শত শত সূচক দিয়ে। রাজনৈতিক দলের পক্ষপাতিত্বের বাইরে, পদ্ধতিগতভাবে, ডেটা দিয়ে।
বাংলাদেশের ভি-ডেম ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসি স্কোর দেখুন:
২০০০ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ০.৪১। মানে মোটামুটি "ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র" এর কাছাকাছি। ২০০৮-০৯ এ একটু উন্নতি হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর নতুন সরকার এলো। কিন্তু ২০১৪ সালের পর? খাড়া পতন। ২০১৪ সালে বিরোধীদলবিহীন নির্বাচন হলো। ২০১৮ সালে আবার বিতর্কিত নির্বাচন। ২০২৪ পর্যন্ত স্কোর নেমে এসেছে ০.২০ এর কাছে। এটা "নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদ" এর পর্যায়ে।
সোজা কথায়: বাংলাদেশে নির্বাচন হয়, কিন্তু সেই নির্বাচন স্বাধীন, সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক কিনা, সেই প্রশ্নে আন্তর্জাতিক পরিমাপকেরা বলছে "না"।
এটা শুধু নির্বাচনের সমস্যা না। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জবাবদিহি। সরকার কি আইনের আওতায়? বিচার বিভাগ কি স্বাধীন? মিডিয়া কি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে? সংসদ কি সরকারকে প্রশ্ন করতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আরেকটা সূচক দেখি। দুর্নীতির ধারণা সূচক, Transparency International এর CPI:
১০০ এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ২৬। বৈশ্বিক গড় ৪৩। মানে বাংলাদেশ বিশ্বের গড়ের অনেক নিচে। ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের র্যাঙ্ক প্রায় ১৪৯। সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর কাতারে।
আর লক্ষ্য করুন, গত দশ বছরে এই স্কোরে কোনো উন্নতি হয়নি। ২০১৫ সালে যা ছিল, ২০২৫ সালেও তাই আছে। প্রতি বছর সরকার বলে "দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স"। কিন্তু সংখ্যা বলছে, কিছুই বদলায়নি।
কিন্তু দুর্নীতি তো শুধু ঘুষ না। দুর্নীতির মূলে আছে আইনের শাসনের অভাব। যেখানে আইন সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে না, সেখানে দুর্নীতি অবধারিত। আইনের শাসনে বাংলাদেশ কোথায়?
পাঁচটা দেশের তুলনা। ইন্দোনেশিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সবার নিচে। ০.৩৮ স্কোর। এমনকি শ্রীলঙ্কা (যেটা ২০২২ সালে দেউলিয়া হয়েছিল) এবং ভিয়েতনাম (যেটা একদলীয় শাসন) তাদের চেয়েও বাংলাদেশ পিছিয়ে।
একটু ভাবুন। একটা দেশ যেখানে আইনের শাসন দুর্বল, সেখানে কী হয়? ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করতে ভয় পায়, কারণ আদালতে ন্যায়বিচার পাবে কিনা জানে না। সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছে যেতে ভয় পায়। সম্পত্তির অধিকার অনিশ্চিত। চুক্তি ভাঙলে প্রতিকার নেই। এই পরিবেশে অর্থনীতি কীভাবে এগোবে?
পর্ব ৩: দুর্নীতির কর
করিম সাহেবের জমির দলিলের গল্পটা মনে আছে? ৪২,০০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছিল। এটা একজনের গল্প। পুরো দেশে এই "অদৃশ্য কর" কত?
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের পরিবারগুলো সরকারি সেবা পেতে বছরে গড়ে ১২,০০০ টাকা ঘুষ দেয়। ৩.৫ কোটি পরিবার হিসাব করলে মোট ঘুষের পরিমাণ প্রায় ৪২,০০০ কোটি টাকা। এটা বাংলাদেশের বার্ষিক স্বাস্থ্য বাজেটের দ্বিগুণেরও বেশি।
কিন্তু ঘুষ শুধু টাকার ক্ষতি না। এর আরো বড় ক্ষতি হলো সময়, সুযোগ, আর বিশ্বাসের ক্ষতি।
একজন উদ্যোক্তা যখন ট্রেড লাইসেন্স পেতে তিন মাস ঘোরে, সে ওই তিন মাস ব্যবসা করতে পারে না। একজন কৃষক যখন সরকারি সারের জন্য দালালকে টাকা দেয়, তার উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। একজন দরিদ্র পরিবার যখন সরকারি হাসপাতালে ঘুষ ছাড়া সেবা পায় না, তারা বেসরকারি হাসপাতালে যায় আর আরো গরিব হয়। দুর্নীতি একটা কর, যেটা সবচেয়ে বেশি চাপায় গরিবদের উপর।
আর এই দুর্নীতি টিকে থাকে কেন? কারণ জবাবদিহি নেই। কেউ প্রশ্ন করতে পারে না। যারা প্রশ্ন করার কথা, মিডিয়া, নাগরিক সমাজ, বিচার বিভাগ, তাদের অবস্থা কেমন?
পর্ব ৪: সংকুচিত পরিসর
একটা সুস্থ গণতন্ত্রে তিনটা জিনিস থাকে: স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, সক্রিয় নাগরিক সমাজ, আর স্বাধীন বিচার বিভাগ। এই তিনটা মিলে সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। বাংলাদেশে তিনটাই সংকটে।
প্রথমে সংবাদমাধ্যম। Reporters Without Borders (RSF) এর প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বাংলাদেশ কোথায়?
২০১০ সালে বাংলাদেশের র্যাঙ্ক ছিল ১২৬। ২০২৫ সালে ১৬৫। ১৮০ দেশের মধ্যে। ক্রমাগত পতন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (পরে সাইবার নিরাপত্তা আইন) সাংবাদিকদের আতঙ্কে রেখেছে। সরকারের সমালোচনা করলে মামলা। টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স সরকারের হাতে। বিজ্ঞাপন বরাদ্দ সরকারের হাতে। ফলে অধিকাংশ মিডিয়া সরকারের সমালোচনা এড়িয়ে চলে। যারা করে, তারা মামলা, হয়রানি, এমনকি গুমের শিকার হয়।
এবার নাগরিক সমাজ। CIVICUS, আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ পর্যবেক্ষণ সংস্থা, প্রতিটা দেশের নাগরিক সমাজের পরিসর মূল্যায়ন করে:
বাংলাদেশের রেটিং: "দমিত" (Repressed)। পাঁচ ধাপের স্কেলে চতুর্থ ধাপ। এনজিও ব্যুরো দিয়ে বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ। সমাবেশের অনুমতি পাওয়া কঠিন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কার্যক্রম সীমিত। Foreign Donations (Voluntary Activities) Regulation Act ২০১৬ এনজিওদের কাজ আরো কঠিন করে দিয়েছে।
আর বিচার বিভাগ? নির্বাহী ক্ষমতার উপর বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কতটুকু?
বাংলাদেশের ভি-ডেম Executive Constraints স্কোর মাত্র ০.২৫। ভারতের ০.৬২। এমনকি ইন্দোনেশিয়ার ০.৫৫। মানে বাংলাদেশে নির্বাহী বিভাগের (অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর অফিসের) উপর কার্যকর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। বিচারপতি নিয়োগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশন, সব প্রতিষ্ঠান কাগজে স্বাধীন কিন্তু বাস্তবে সরকারের প্রভাবাধীন।
এই তিনটা মিলিয়ে একটা ছবি তৈরি হয়: অনুভূমিক জবাবদিহি, মানে সরকারের বিভিন্ন অংশের একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা, সেটা ভেঙে পড়েছে।
২০০৫ সালে বাংলাদেশের অনুভূমিক জবাবদিহি স্কোর ছিল ০.৪২। ২০২৫ সালে ০.১৭। দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের অনেক নিচে। এটা মানে হলো, সরকার যা ইচ্ছা তাই করতে পারে এবং কোনো প্রতিষ্ঠান তাকে থামাতে পারে না। সংসদ? বিরোধী দল অনুপস্থিত বা দুর্বল। বিচার বিভাগ? চাপের মুখে। দুর্নীতি দমন কমিশন? নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের হাতিয়ার হয়ে গেছে। মিডিয়া? ভয়ে চুপ।
"পাহারাদারকে কে পাহারা দেবে?" রোমান কবি জুভেনালের এই প্রশ্নটা বাংলাদেশের জন্য আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পাহারাদার (সরকার) আছে, কিন্তু তাকে পাহারা দেওয়ার কেউ নেই।
পর্ব ৫: প্যারাডক্স
এতক্ষণ যা পড়লেন, তাতে মনে হতে পারে বাংলাদেশ একটা ব্যর্থ রাষ্ট্র। কিন্তু একটা আশ্চর্য জিনিস আছে। এই দুর্বল শাসন, দুর্নীতি, আর প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয় সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দুই দশক ধরে ৬% এর উপরে প্রবৃদ্ধি করেছে। এটা কীভাবে সম্ভব?
এই স্ক্যাটার প্লটটা দেখুন। ২০ টা দেশ। X-অক্ষে শাসনের মান, Y-অক্ষে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশ বাম দিকে উপরে, মানে দুর্বল শাসন কিন্তু উচ্চ প্রবৃদ্ধি। এটাই "বাংলাদেশ প্যারাডক্স"। অর্থনীতিবিদরা এই ঘটনার কয়েকটা ব্যাখ্যা দেন।
প্রথমত, গার্মেন্টস শিল্প। ১৯৮০ এর দশকে শুরু হওয়া এই শিল্প এখন ৪০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি খাত। এটা মূলত বেসরকারি উদ্যোগ, সরকারের ভূমিকা সীমিত। দ্বিতীয়ত, রেমিট্যান্স (আগের ন্যারেটিভে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে)। তৃতীয়ত, এনজিও সেক্টর। ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, এনজিওরা সরকারের ব্যর্থতার জায়গায় শূন্যস্থান পূরণ করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্ষুদ্রঋণ, এসব ক্ষেত্রে এনজিওদের অবদান বিশাল।
কিন্তু এই তিনটাই সরকারের সাফল্য না। সরকার সত্ত্বেও এগুলো হয়েছে, সরকারের কারণে না।
আর এই প্যারাডক্সের একটা সীমা আছে। বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছে। ২০২৬ সালে LDC থেকে স্নাতক হচ্ছে। কিন্তু মধ্যম আয়ের ফাঁদ পেরোতে হলে যা দরকার, জটিল অবকাঠামো, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, এসবের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দরকার। সস্তা শ্রম আর গার্মেন্টস দিয়ে ৬% প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ১০% প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি রপ্তানি, এসব দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান দিয়ে হবে না।
সরকারি কার্যকারিতায় বাংলাদেশ -০.৮২। ভিয়েতনাম +০.০৮। ভিয়েতনামে সরকার কার্যকরভাবে নীতি বাস্তবায়ন করতে পারে। বাংলাদেশে পারে না। এটা শুধু দুর্নীতির সমস্যা না, সক্ষমতার সমস্যাও। সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ নেই, প্রযুক্তি ব্যবহার কম, নিয়োগ রাজনৈতিক বিবেচনায়, পদোন্নতি যোগ্যতায় না।
তবে একটা উজ্জ্বল দিক আছে:
সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বে বাংলাদেশ ভারত আর শ্রীলঙ্কার চেয়ে এগিয়ে। ২১% নারী সদস্য। সংরক্ষিত আসনসহ এই সংখ্যা। বৈশ্বিক গড় ২৬.৫% এর চেয়ে কম হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় এটা উল্লেখযোগ্য। শুধু তাই না, বাংলাদেশে গত তিন দশকে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নারী, বিরোধীদলীয় নেত্রী ছিলেন নারী, স্পিকার ছিলেন নারী। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক উন্নত দেশের চেয়ে ভালো।
কিন্তু প্রশ্ন হলো: এই উজ্জ্বল দিকগুলো কি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়ের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারবে?
অর্থনীতিবিদ দারন আচেমোগলু আর জেমস রবিনসনের গবেষণা (Why Nations Fail) বলে, দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশ সমৃদ্ধ হতে পারে না যদি তার প্রতিষ্ঠানগুলো "extractive" হয়, মানে ক্ষমতা আর সম্পদ অল্প কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। "Inclusive" প্রতিষ্ঠান দরকার, যেখানে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকৃত, আইন সবার জন্য সমান, আর সুযোগ উন্মুক্ত। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো কোন দিকে যাচ্ছে?
সংখ্যা বলছে: extractive এর দিকে। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, জবাবদিহি কমছে, নাগরিক পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখনো আছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি নড়বড়ে। একটা বাড়ি যার ভিত্তি দুর্বল, সেটা কয়েক তলা উঠতে পারে। কিন্তু আরো উপরে উঠলে? ভেঙে পড়বে।
এবার করিম সাহেবের কাছে ফিরে আসি।
করিম সাহেবের জমির দলিল এখনো হয়নি। আরো তিন মাস লাগবে। আরো কিছু ঘুষ দিতে হবে। উনি এখন হতাশ, কিন্তু অবাক হচ্ছেন না। কারণ এটাই স্বাভাবিক। এটাই সবসময় ছিল। এটাই থাকবে। এই "এটাই থাকবে" মানসিকতাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
করিম সাহেবের মতো কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন এই ব্যবস্থার সাথে আপোষ করছে। ঘুষ দিচ্ছে, কারণ বিকল্প নেই। লাইনে দাঁড়াচ্ছে, কারণ উপায় নেই। চুপ থাকছে, কারণ কথা বললে বিপদ। এই আপোষের সংস্কৃতি দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখে, আর দুর্নীতি আপোষকে বাধ্য করে। একটা দুষ্টচক্র।
এই চক্র ভাঙতে হলে প্রতিষ্ঠান দরকার। স্বাধীন বিচার বিভাগ, কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন মিডিয়া, সক্রিয় নাগরিক সমাজ। এগুলো ছাড়া গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা, সত্যিকারের জনগণের শাসন না।
পাহারাদারকে কে পাহারা দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর হলো: প্রতিষ্ঠান। শক্তিশালী, স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে সেই প্রতিষ্ঠান নেই। তৈরি করতে হবে। আর সেই তৈরি করার দায়িত্ব শুধু সরকারের না। সরকার নিজেই তো সমস্যার অংশ। দায়িত্ব নাগরিকদের। আপনার, আমার।
করিম সাহেব পরের বার ভূমি অফিসে যাবেন। এবারও ঘুষ দিতে হবে। কিন্তু যেদিন উনি ঘুষ দিতে অস্বীকার করবেন, যেদিন লাখো করিম সাহেব একসাথে বলবে "না, আমরা এটা মানি না", সেদিন থেকে বদলানো শুরু হবে। সংখ্যা বলছে, ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। কিন্তু সংখ্যা এটাও বলছে: বাংলাদেশের মানুষ আগেও অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। সস্তা শ্রম দিয়ে ৪০ বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্টস শিল্প গড়েছে। ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে দারিদ্র্য অর্ধেকে নামিয়েছে। একটা বন্যাপ্রবণ ব-দ্বীপে ১৭ কোটি মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজটাও পারবে। যদি চায়।