আপনার মেয়ে কেন ঘরে বসে আছে?
পর্ব ১: তাসলিমার গল্প
তাসলিমা নাম ধরুন। বয়স ২৪। ঢাকার একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ পাশ করেছে। সিজিপিএ ৩.৫। ইংরেজি ভালো বলতে পারে। কম্পিউটার জানে। সিভি দিয়েছে ৪৭টা জায়গায়। ইন্টারভিউ হয়েছে ৬টা। চাকরি পায়নি একটাও।
তার ভাই ফাহিম। বয়স ২১। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ কোর্স করেছে। সিজিপিএ ২.৮। একটা গার্মেন্টস কোম্পানিতে অ্যাডমিন অফিসার হিসেবে চাকরি পেয়ে গেছে মাস দুয়েকের মধ্যে। বেতন ২০,০০০ টাকা।
তাসলিমা ফাহিমের চেয়ে বেশি পড়ালেখা করেছে, বেশি যোগ্য, কিন্তু ঘরে বসে আছে। মা বলেন, "বিয়ে দিয়ে দাও।" বাবা বলেন, "মেয়েদের চাকরি পাওয়া কঠিন।" তাসলিমা জানে সে পারে, কিন্তু কেউ সুযোগ দিচ্ছে না।
তাসলিমা একা না। বাংলাদেশে লাখ লাখ তাসলিমা আছে।
এবার একটু জুম আউট করুন।
বাংলাদেশে কর্মক্ষম বয়সের (১৫ বছরের বেশি) নারীদের মধ্যে কতজন কাজ করে বা কাজ খুঁজছে? এটাকে বলে শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ হার (Labour Force Participation Rate)। এই চার্টটা দেখুন:
২০০০ সালে নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ হার ছিল ২৩.৯%। তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ২০১০ সালে ৩৬%। ২০১৭ সালে সর্বোচ্চ ৩৬.৩%। তারপর? থেমে গেলো। ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপে এটা নেমে আসে ৪২.৬ মিলিয়ন থেকে প্রায় স্থবির অবস্থায়। সর্বশেষ হিসাবে প্রায় ৩৪-৩৫%।
মানে গত আট বছরে বাংলাদেশের নারী শ্রমশক্তি বাড়া তো দূরের কথা, কমে আসছে। এটা কি স্বাভাবিক? একটু দেখি পুরুষদের সাথে তুলনা করলে কী দাঁড়ায়।
পুরুষদের শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ হার ৮০% এর উপরে, মোটামুটি স্থিতিশীল। আর নারীদের? ৩৫% এর আশেপাশে। ফারাকটা প্রায় ৪৫ শতাংশ পয়েন্ট। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লিঙ্গ-বৈষম্যগুলোর একটা এটা।
কিন্তু বাংলাদেশ তো একা না। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলোর অবস্থা কী? এই চার্টটা দেখুন:
ভিয়েতনামে নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ হার ৭২%। কম্বোডিয়ায় ৭৫%। শ্রীলঙ্কায় ৩৩%। ভারতে ৩২%। বাংলাদেশ ৩৫% নিয়ে ভারত আর শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি, কিন্তু ভিয়েতনাম আর কম্বোডিয়ার ধারেকাছেও না। অথচ বাংলাদেশ গার্মেন্টস রপ্তানিতে ভিয়েতনামের প্রতিদ্বন্দ্বী। নারী শিক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ায় এগিয়ে। তাহলে কেন নারীরা কাজ করছে না?
পর্ব ২: যত পড়ো, তত ঘরে বসো
এখানেই আসল প্যারাডক্সটা। সাধারণ যুক্তি হলো: শিক্ষা বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়ে। পড়ালেখা বেশি করলে ভালো চাকরি পাওয়া যায়। ছেলেদের ক্ষেত্রে এটা মোটামুটি সত্য। কিন্তু বাংলাদেশের মেয়েদের ক্ষেত্রে? উল্টো।
যে নারীদের কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাদের কর্মসংস্থান হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪০%। কেন? কারণ তারা কৃষিকাজ, গৃহকর্মী, ইটভাটায় কাজ, এসব করে। অন্য উপায় নেই, কাজ করতেই হবে, বেঁচে থাকার জন্য।
মাধ্যমিক পাশ? কর্মসংস্থান হার কমে আসে ৩০% এর কাছে। উচ্চমাধ্যমিক? আরো কমে। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি? মাত্র ২২-২৫%। মানে যত বেশি পড়ালেখা, তত কম কাজ।
এটা শুনতে পাগলামি মনে হয়, কিন্তু কারণটা সোজা। কম শিক্ষিত নারীদের কাজের বিকল্প নেই, তাদের খেটে খেতে হয়। শিক্ষিত নারীরা "ভালো চাকরি" চায়, কিন্তু ভালো চাকরি তাদের জন্য নেই। তারা কৃষিকাজ করবে না (সামাজিক মর্যাদা), গার্মেন্টসে যাবে না (পরিবার রাজি না), আর অফিসের চাকরি পাচ্ছে না। ফলে ঘরে বসে থাকে।
তাসলিমার গল্পটা মনে আছে? ঠিক এটাই তার সমস্যা। সে অনেক যোগ্য, কিন্তু শ্রমবাজার তার জন্য তৈরি না।
তাহলে নারীরা কোথায় কাজ করে? কোন খাতে? এই চার্টটা দেখুন:
পুরুষদের কাজ ছড়িয়ে আছে, কৃষি, শিল্প, পরিবহন, নির্মাণ, সেবা, সবখানে। নারীদের? দুটো জায়গায় কেন্দ্রীভূত। কৃষি আর গার্মেন্টস। দুটো মিলিয়ে নারী কর্মীদের প্রায় ৬৫% এই দুই খাতে। সেবা খাতে (ব্যাংক, আইটি, টেলিকম, হোটেল) নারীদের উপস্থিতি অত্যন্ত কম।
মানে বাংলাদেশের অর্থনীতি নারীদের জন্য মূলত দুটো দরজা খোলা রেখেছে: মাঠে কাজ করো, নয়তো কারখানায়। বাকি সব দরজা বন্ধ। আর এই দুটো দরজাও সংকুচিত হচ্ছে।
পর্ব ৩: গার্মেন্টস যা দিলো, আর যা দিলো না
বাংলাদেশের নারী শ্রমশক্তির গল্প গার্মেন্টস ছাড়া বলা অসম্ভব। ১৯৮০-র দশকে যখন গার্মেন্টস শিল্প শুরু হলো, লাখ লাখ গ্রামের মেয়ে প্রথমবারের মতো ঘর থেকে বের হলো। নিজের হাতে টাকা ধরলো। পরিবারের উপর নির্ভরশীলতা কমলো। বিয়ের বয়স বাড়লো। সন্তান সংখ্যা কমলো। এটা ছিল একটা বিপ্লব।
কিন্তু গার্মেন্টস নিজেই বদলে যাচ্ছে। এই চার্টটা দেখুন:
১৯৯০-এর দশকে গার্মেন্টস কারখানায় ৮০% কর্মী ছিল নারী। আজ? ৬০% এর কাছে নেমে এসেছে। অটোমেশন বাড়ছে, নতুন মেশিন চালাতে "দক্ষ" শ্রমিক লাগে, আর সেই প্রশিক্ষণ পুরুষরা বেশি পাচ্ছে। তাছাড়া, গার্মেন্টসের বাইরে নারীদের জন্য শিল্পায়নের দ্বিতীয় ধাপ কখনো আসেনি।
ভিয়েতনামে কী হয়েছে? গার্মেন্টসের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক্স, জুতা, ফার্নিচার, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, সব খাতে নারীরা ঢুকেছে। কারখানার পাশে ডরমিটরি আছে, ডে-কেয়ার আছে, বাসের ব্যবস্থা আছে। বাংলাদেশে? গার্মেন্টসই একমাত্র পথ, আর সেই পথও সরু হয়ে আসছে।
তাহলে বাকি খাতে কেন নারীরা ঢুকতে পারে না? কারণগুলো জটিল, কিন্তু জরিপ ডেটা কিছু উত্তর দেয়। এই চার্টটা দেখুন:
নারীরা কেন কাজ করে না, এই প্রশ্নের উত্তরে সবচেয়ে বড় কারণ: গৃহস্থালি কাজ ও সন্তান দেখাশোনা (৩৮%)। তারপর পরিবারের অনুমতি না পাওয়া (২২%)। তারপর নিরাপত্তার অভাব ও যাতায়াত সমস্যা (১৮%)। "উপযুক্ত কাজ নেই" (১৪%)। এবং সামাজিক চাপ (৮%)।
লক্ষ্য করুন: উপরের তিনটা কারণের কোনোটাই যোগ্যতার সাথে সম্পর্কিত না। তাসলিমা যোগ্য, কিন্তু রাস্তায় হয়রানি হয়, বাসে উঠতে ভয় লাগে, সন্ধ্যার পর বাইরে থাকা নিরাপদ না, আর পরিবার বলে, "এত দূরে অফিস? না, যেও না।"
আর গৃহস্থালি কাজের বোঝা? এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশে নারীরা দিনে গড়ে ৫.৭ ঘণ্টা অবৈতনিক গৃহকর্ম করে, রান্না, পরিষ্কার, সন্তান দেখাশোনা, বয়স্কদের সেবা। পুরুষরা? ০.৮ ঘণ্টা। পার্থক্যটা সাত গুণ। মানে একজন নারী যদি সকাল ৯টায় অফিসে যেতে চায়, তাকে ভোর ৫টায় উঠে রান্না করতে হবে, সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে হবে, ঘর গুছাতে হবে, তারপর অফিসে যেতে হবে, আবার ফিরে এসে সন্ধ্যায় রান্না, ঘর গোছানো। একজন পুরুষ? সকালে চা খেয়ে বের হয়, রাতে ফিরে খায়, ঘুমায়।
এটা শুধু "সংস্কৃতি" না। এটা একটা অর্থনৈতিক কাঠামো যেখানে নারীর অবৈতনিক শ্রমকে "কাজ" হিসেবে গণ্যই করা হয় না। অথচ এই শ্রম ছাড়া কোনো পরিবার চলবে না, কোনো পুরুষ অফিসে যেতে পারবে না।
পর্ব ৪: NEET প্রজন্ম
তাসলিমার মতো যারা পড়ালেখা শেষ করেও কাজ পাচ্ছে না, তাদের একটা নাম আছে আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে: NEET (Not in Education, Employment, or Training)। শিক্ষায় নেই, কর্মসংস্থানে নেই, প্রশিক্ষণেও নেই। শুধু আছে।
বাংলাদেশে এই সংখ্যা কত? এই চার্টটা দেখুন:
১৫-২৪ বছর বয়সী পুরুষদের NEET হার প্রায় ১০%। একই বয়সের নারীদের? ৩২%। প্রায় তিন গুণ। ২৫-২৯ বছর বয়সে? আরো ভয়াবহ। নারীদের NEET হার ৩৫% ছাড়িয়ে যায়। মানে প্রতি তিনজন তরুণীর একজন শিক্ষাতেও নেই, কাজেও নেই। শুধু ঘরে বসে আছে, বিয়ের অপেক্ষায়, অথবা বিয়ের পরে সংসার করছে।
এটা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি না। এটা জাতীয় ক্ষতি। প্রতিটা তরুণী যে কাজ করতে পারতো কিন্তু করছে না, সেটা হারানো উৎপাদনশীলতা। হারানো আয়কর। হারানো ভোক্তা ব্যয়। হারানো উদ্ভাবন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশে "মানবসম্পদের ক্ষতি" (Human Capital Loss) লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে জিডিপির প্রায় ৬-৮%।
এর মানে কী? ধরুন বাংলাদেশের জিডিপি ৪৬০ বিলিয়ন ডলার। ৬% মানে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার। প্রতি বছর। এই টাকা কোথাও যাচ্ছে না, শুধু তৈরি হচ্ছে না। কারণ অর্ধেক জনসংখ্যা অর্থনীতির বাইরে বসে আছে।
পর্ব ৫: যদি তাসলিমা কাজ পেতো
এবার একটু কল্পনা করুন। বাংলাদেশের নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ হার যদি ভিয়েতনামের সমান হতো (৭২%), তাহলে কী হতো? অথবা ধরুন ভিয়েতনামের মতো না হোক, অন্তত ৫০% যদি হতো? এই চার্টটা দেখুন:
আইএমএফ ও ম্যাককিনসির গবেষণা অনুযায়ী, নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ ৫০% এ নিয়ে গেলে বাংলাদেশের জিডিপি ১২-১৫% বাড়তে পারে। ৭০% এ নিয়ে গেলে? ২০-৩০%। ডলারের হিসাবে? ৫৫-১৪০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত জিডিপি। প্রতি বছর। এটা তিনটা পদ্মা সেতু বানানোর খরচের চেয়ে বেশি। প্রতি বছর।
কিন্তু এটা তো শুধু সংখ্যা। আসল প্রশ্ন: কীভাবে?
অন্য দেশেরা কীভাবে নারীদের কাজে আনলো, সেটা দেখলে কিছু পথ পাওয়া যায়।
ভিয়েতনাম: শিল্পায়নের প্রতিটা ধাপে নারীদের যুক্ত করেছে। গার্মেন্টস থেকে ইলেকট্রনিক্স, প্যাকেজিং, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ পর্যন্ত। কারখানার পাশে শ্রমিক আবাসন, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি করেছে। ফলাফল: নারী LFPR ৭২%।
রুয়ান্ডা: গণহত্যার পর দেশ পুনর্গঠনে নারীদের নেতৃত্বে আনলো। সংসদে ৬০%+ নারী সদস্য। জমির অধিকার দিলো, ক্ষুদ্রঋণ সহজ করলো, বাধ্যতামূলক মাতৃত্বকালীন ছুটি চালু করলো। ফলাফল: নারী LFPR ৮৪%।
বাংলাদেশ কী করতে পারে? তিনটা পদক্ষেপ যেগুলো অন্য দেশে কাজ করেছে:
প্রথম: শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন, প্রতিটা ইউনিয়ন পরিষদে, প্রতিটা শিল্প এলাকায়। নারীদের কাজে যাওয়ার সবচেয়ে বড় বাধা "সন্তান কে দেখবে?" এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
দ্বিতীয়: নিরাপদ পরিবহন। আলাদা বাস সার্ভিস না হোক, অন্তত কারখানা ও অফিস এলাকায় নিরাপদ শাটল সার্ভিস। যাতায়াতে হয়রানি নারীদের কাজ ছাড়ার অন্যতম কারণ।
তৃতীয়: গার্মেন্টসের বাইরে শিল্পায়ন, ইলেকট্রনিক্স, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, এই খাতগুলোতে নারী নিয়োগে প্রণোদনা। শুধু গার্মেন্টসে আটকে থাকলে নারী কর্মসংস্থান আর বাড়বে না।
আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।
তাসলিমা আজও ঘরে বসে আছে। ফোনে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে। মাঝে মাঝে ফ্রিল্যান্সিং করার চেষ্টা করে, কিন্তু লোডশেডিংয়ে ইন্টারনেট থাকে না। পরিবারের চাপ বাড়ছে বিয়ের জন্য। তার বান্ধবীদের মধ্যে যারা চাকরি পেয়েছে, তারা বেশিরভাগ গার্মেন্টসে বা এনজিওতে। বাকিরা তাসলিমার মতো ঘরে।
বাংলাদেশ নারী শিক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ায় এগিয়ে। মেয়েদের স্কুলে ভর্তির হার ছেলেদের চেয়ে বেশি। এটা একটা বিশাল অর্জন। কিন্তু শিক্ষার পর কী? স্কুল শেষে ঘরে ফিরে যাওয়া? বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে বিয়ের অপেক্ষা করা?
আমরা নারীদের পড়ালেখা শিখিয়েছি, কিন্তু কাজ দিইনি। স্বপ্ন দেখিয়েছি, কিন্তু পথ তৈরি করিনি। এটা শুধু নারীদের সমস্যা না। এটা বাংলাদেশের সমস্যা। কারণ অর্ধেক জনসংখ্যা যদি ঘরে বসে থাকে, তাহলে দেশ কখনো তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাবে না।
প্রশ্নটা সোজা: আমরা কি তাসলিমাকে একটা সুযোগ দিতে পারি? নাকি আমরা মেনে নিয়েছি যে মেয়েদের জায়গা ঘরে?